শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, কমতে শুরু করেছে তেলের দাম

যুদ্ধবিরতির খবরে ইরানে সাধারণ নাগরিকদেরকে সড়কে আনন্দ মিছিল করতে দেখা গেছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধবিরতির খবরে ইরানে সাধারণ নাগরিকদেরকে সড়কে আনন্দ মিছিল করতে দেখা গেছে
পড়ার সময়: ৪ মিনিট

রাতভর ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই খবরে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম।

যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি তখনই কার্যকর হবে যখন ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে 'সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে' চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মি. শরীফ। ফলে অবিলম্বেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।

"আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে," বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ।

যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার জন্য উভয়পক্ষ স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।

"উভয় দেশ যে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছে, আমি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। এই উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষই অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে কাজ করেছে," সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন শাহবাজ শরীফ।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও আলোচনার জন্য' দশই এপ্রিল শুক্রবার ইসলামাবাদে একটি বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান। সেখানে উভয়পক্ষের প্রতিনিধি দলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মি. শরীফ।

"আমরা আন্তরিকভাবে আশাকরি, 'ইসলামাবাদ আলোচনা' টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে এবং সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে আরও সুসংবাদ জানাতে চাই," বলেন মি. শরীফ।

যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ

ছবির উৎস, RAHAT DAR/EPA-EFE/REX/SHUTTERSTOCK

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে ইরানের দশ দফার প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

"পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া দশ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে," সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন ট্রাম্প।

যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান, উভয়পক্ষ নিজেদের বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছে।

যুদ্ধবিরতির খবরে ইরানে সাধারণ নাগরিকদেরকে সড়কে আনন্দ মিছিল করতে দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করার জন্য যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং 'আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য উভয়পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, ইরানে দুই সপ্তাহের হামলা না চালানো যে সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, সেটাকে ইসরায়েল সমর্থন করে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।

তবে এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

'পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়'

ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র যে একটি 'পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়' অর্জন করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সমৃদ্ধ পরমাণুর 'ঠিকমত দেখভাল করা হবে' বলে জানান তিনি।

"সেটা নাহলে আমি মীমাংসা করতাম না," বার্তাসংস্থা এএফপি'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন ট্রাম্প।

তবে ইরানের ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি।

যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে চীনও ভূমিকা রেখেছে বলে জানতে পেরেছেন ট্রাম্প।

যুদ্ধবিরতি ভেস্তে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে আবার ইরানের বেসামরিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করার অবস্থানে ফিরে যাবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "সেটা আপনারা দেখতে পাবেন"।

সামাজিক মাধ্যমেরএক বার্তায় হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন, "এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিজয়, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমাদের অসাধারণ সামরিক বাহিনীর কারণে সম্ভব হয়েছে।"

ইরানে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, ইরান সরকারও এটিকে নিজেদের একটি 'বড় বিজয়' হিসেবে তুলে ধরছে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এসএনএসসিআই) এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান এই যুদ্ধে তার 'প্রায় সব লক্ষ্যেই অর্জন করেছে এবং শত্রুপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে।'

এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি প্রকাশ করেছে।

সেখানে বলা হয়েছে, অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করার শর্তে দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর হামলা স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়েছেন, ইসরায়েল তা সমর্থন করে।

তবে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।

যদিও যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ আগে জানিয়েছিলেন যে, লেবাননও এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

কমতে শুরু করেছে তেলের দাম

যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আগামী দুই সপ্তাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।

"ইরানের ওপর হামলা বন্ধ থাকলে আমাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও তাদের অভিযান বন্ধ রাখবে" বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি আবারও উন্মুক্ত করা হলেও সেখান দিয়ে চলাচল করতে হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।

যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর প্রথম এক ঘণ্টায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ১৩ দশমিক ছয় শতাংশ কমে বুধবার ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে এসেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও প্রায় ১৪ দশমিক তিন শতাংশ কমে প্রতিব্যারেল ৯৬ দশমিক ৮০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

মঙ্গলবার পর্যন্তও প্রতিব্যারেল তেল ১০০ ডলারের অনেক ওপরে বিক্রি হচ্ছিল।

যদিও তেলের দরে বড় পতন দেখা গেলেও সেটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৭০ ডলারের মতো।

যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল।