প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুক পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে একজন গ্রেপ্তার, ঠিক কী ঘটেছে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, জান্নাতুল তানভী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামের এক ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ঘটনায় আবারো আইনের অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২৬শে মার্চ রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কিন্তু গ্রেফতারের পরদিন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাস দমন আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলু।
মুক্তাগাছা থানার পুলিশ ৫৪ ধারায় মি. হককে গ্রেফতার দেখিয়ে বিচারিক আদালতে পাঠায়।
পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
গ্রেফতারের পরদিন করা মামলা এবং তাতে কী অভিযোগ আনা হয়েছে এমন বিষয় জানতে চাইলে কথা বলতে রাজি হননি মামলার বাদী মি. ফজলু।
তবে, ময়মনসিংহ আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
"এই মামলাটি মুক্তাগাছা কগনিজেন্স আদালতে আছে, এটার এফআইআর হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ দুইটার অধীনে মামলা হইছে" বলেন মি. রহমান।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এদিকে, মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, হয়রানিমূলক ধারার জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করলেও নতুন করে যেসব আইন ও অধ্যাদেশ করা হয়েছে তাতেও এমন বিতর্কিত ধারা রয়ে গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বিবিসি বাংলাকে জানান, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন থেকে শুরু করে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশসহ এই নিয়ে চারবার আইনটি পরিবর্তন করা হলো।
"এখন বিপত্তি হলো প্রত্যেকবারই কিছু লিবারেলাইজ হয়েছে। কিন্তু এবিউজের সুযোগটা থেকেই যাচ্ছে। আমরা বারবার বলে আসছি, এটা যাতে কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে(কনট্রাডিক্টরি) বিপরীতধর্মী না হয়ে যায়," বলেন মি. ইকবাল।
আইনজীবীরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশ যদি ত্রিশ দিনের মধ্যে নতুন সরকার বাতিল না করে তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
অর্থাৎ এই সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ বর্তমান জাতীয় সংসদে আইনে পাশ করা না হলে এটি অটো বাতিল হয়ে যাবে।
এদিকে, এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী বলেন, "প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একজন নারীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রকাশ করবে, এটাতো অবশ্যই আইনের আওতায় আসা উচিত। কারণ তা নাহলে সমাজে তো বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।"
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ

ছবির উৎস, Getty Images
মুক্তাগাছায় ঠিক কী ঘটেছে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশে একজন নারীর ছবি বসিয়ে একটি ফটোকার্ড তৈরি করে সেটি তারেক রহমানের নাম সম্বলিত একটি ফেসবুক পেইজে পোস্ট করা হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার, ২৬শে মার্চ এই পোস্টটি গ্রেফতারকৃত আজিজুল হকের অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পোস্টটিকে ঘিরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ঝনকা বাজারে রাতেই বিক্ষোভ শুরু করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ময়মনসিংহের স্থানীয় একজন সাংবাদিক জানান, এই ঘটনাকে ঘিরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমানের ওপর মি. হককে গ্রেফতারের জন্য 'মব করে চাপ দেয়'।
মুক্তাগাছা থানার ওসি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মামলা হওয়ার আগেই মি. হককে গ্রেফতার করেছেন কোন অভিযোগে এমন প্রশ্নে বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "তার পোস্ট ভাইরাল হয়ে গেছে, ওইটা দেখছি।"
"এলাকার লোকজন এসে তথ্য দিচ্ছে তার পোস্টের, পরে তাকে গ্রেফতার করছি। অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বুঝে তাকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করছি। আমার ওপর চাপ প্রয়োগ বা মব হয় নাই" বলেন পুলিশ কর্মকর্তা মি. রহমান।
এদিকে, পরদিন শুক্রবার ফেসবুকে পোস্টের এই ঘটনায় মামলা করেন মো. ফজলু।
বিবিসি বাংলা ফোন করলে প্রথমে প্রশ্ন জানতে চাইলেও পরে তিনি পারিবারিক কাজে ব্যস্ত আছেন বলে কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

ছবির উৎস, Just_Super
কী পরিবর্তন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে?
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন হলেও পুরোনো বিতর্কিত ধারা রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
এর মধ্যে অন্যতম পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশী ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া।
নতুন অধ্যাদেশের ৩৫(ঘ) ধারায় বলা হয়েছে, যদি পুলিশ মনে করে কোনো ব্যক্তি এ আইনের অধীনে অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন, তাহলে তাকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে।
আগের আইনেও এই বিতর্কিত ক্ষমতা ছিল, যেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল।
তবে কিছু পরিবর্তনও এসেছে।
নতুন অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা নিয়ে সমালোচনার অপরাধের দণ্ডের বিধান আর রাখা হয়নি।
পূর্ববর্তী আইনের ২১ ধারায় এসব বিষয়ে 'বিদ্বেষ' ছড়ানোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হতো।
এবার সেই ধারা পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে নতুন অধ্যাদেশে সাইবার অপরাধের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা(এআই) টুল ব্যবহার করে কোনো নেটওয়ার্কে অবৈধ প্রবেশ বা ক্ষতিসাধনকে এখন থেকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হবে।
এতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধানও রয়েছে।
অধ্যাদেশে আরও উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করে শাস্তি ও জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।
এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২,৪,৫,৬, ৮,১০,১১,১৫,১৯ এই নয়টি ধারা বাতিল করে এসব ধারায় বিচারাধীন এবং তদন্তাধীন থাকা সব মামলা বাতিল করা হয়েছে।
এমনকি আদালতের দেওয়া সাজাও কার্যকর হবে না।

ছবির উৎস, Getty Images
'আগের অবস্থারই পুনরাবৃত্তি চলছে'
২০০৬ সালের তথ্য প্রযুক্তি আইন রহিত করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন প্রণয়ন করা হয়।
এই আইনটি হওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আগ পর্যন্ত গত কয়েক বছরে সাংবাদিক, রাজনীতিক, শিল্পী, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, গার্মেন্টসকর্মী থেকে শিক্ষক ছাত্র পর্যন্ত আসামী হয়ে জেল খেটেছেন।
এই আইনের কিছু ধারা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়েছিল মানবাধিকার কর্মীরা।
সেসময় এই আইনে গ্রেফতার, হয়রানির অভিযোগ প্রায়শই শোনা যেত।
কার্টুনিস্ট কিশোর আহমেদ এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে গ্রেফতার নিয়ে সেসময় ব্যাপক সমালোচনা হয়।
পরে কারাগারেই মারা যান মুশতাক আহমেদ।
পরে সেটি পরিবর্তন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ প্রণীত হয়।
এতে কিছু ধারা বাতিল, সাজার পরিমাণ কমানো, মিথ্যা মামলা দায়ের করলে সেটি অপরাধ বিবেচনা করে শাস্তির বিধান করা হয় এতে।
একইসাথে অ-জামিনযোগ্য ধারা ১৪ টি থেকে কমিয়ে চারটি করা হয়।
কিন্তু পুলিশের কাছে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা রাখায় এই আইনেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকার কথা জানায় মানবাধিকার কর্মীরা।
পরে সমালোচিত এই আইনটিও বাতিল করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ণ করা হয়।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মামলা হওয়ার আগেই অতি উৎসাহী ব্যক্তিদের কারণে এই আইনটির যত্রতত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। উপযাচক হিসেবে পুলিশ অনেক সময় এই বিষয়ে অতি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনেরই পুনরাবৃত্তি দেখছি, অতি উৎসাহী ব্যক্তিদের কারণে এই আইনটির যত্রতত্র ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।"
"বাংলাদেশে অনেক বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সেদিকে নজর না দিয়ে ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করার জন্য উপযাচক হয়ে যে কাজগুলো প্রশাসন থেকে করা হয় সেই জায়গাগুলো আগের মতোই আছে" বলেন মি. লিটন।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলছেন, চারবার একই আইনের পরিবর্তন হয়ে লিবারালাইজ হলেও এখনো কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়নি।
মতপ্রকাশ সংক্রান্ত বিষয় এই আইন থেকে রহিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল।
তবে "প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একজন নারীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রকাশের" ঘটনা "অবশ্যই আইনের আওতায় আসা উচিত" মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, "একজন নারী ও পুরুষকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলে সেটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে কার্টুন আঁকা, ক্যারিকেচার করা সেটি অন্য বিষয়। সমালোচনা করে সেটা হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের উদ্দেশ্য প্রণোদিত কাজ গর্হিত অন্যায়, সেটি অবশ্যই আইনের আওতায় আসা উচিত।"
৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিষয়ে সমালোচনার কথা উল্লেখ করলে তিনি মন্তব্য করেন, নিবর্তনমূলক আইন থাকা উচিত নয়, তবে এ ধরনের অপরাধ অবশ্যই শাস্তির আওতায় আসা উচিত।








