রূপান্তরকামীদের সংজ্ঞা কেন বদলাতে চাইছে ভারতের সরকার?

ছবির উৎস, ANI
ভারতের সংসদের নিম্ন কক্ষ লোকসভায় গত ১৩ই মার্চ 'ট্রান্সজেন্ডার পারসন্স (অধিকার ও সুরক্ষা) সংশোধনী বিল' ২০২৬ পেশ করা হয়েছে। বিল পেশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে একাধিক শহরে বিক্ষোভ করেছেন এর বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা।
এই সংশোধনীতে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের সংজ্ঞা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিজের লিঙ্গপরিচয় নিজেই ঠিক করার অধিকার বা 'সেল্ফ আইডেন্টিফিকেশনের অধিকার'কে এই বিলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বর্তমানে যে আইন চালু আছে ২০১৯ সাল থেকে, সেটি অনুযায়ী একজন রূপান্তরকামীর নিজেরই সেই অধিকার ছিল।
সরকারের মতে, ২০১৯ সালের আইনটি বাস্তবায়নে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। তাই, 'ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি'র সংজ্ঞাটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আইনের সুবিধা যাতে শুধুমাত্র যার দরকার তার কাছেই পৌঁছায় এবং তার কোনো অপব্যবহার না হয়, সেই বিষয়ে সতর্ক হতে চাইছে সরকার, এমনটাই দাবি তাদের।
তবে সংশোধনী বিলটি উত্থাপনের পর দেশের বিভিন্ন অংশে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
রূপান্তরকামী মানুষদের কিছু প্রতিনিধির মতে, এই সংশোধনী ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়কে বিপন্ন করবে। তাদের আরও অভিযোগ, বিলটি ট্রান্স পরিচয়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে।
কিন্তু এই প্রশ্নগুলো উঠছে কেন? খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা যাক।

ছবির উৎস, Noah SEELAM / AFP via Getty Images
কী ছিল আগের আইনে?
ভারতে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের পরিচয় ও অধিকার সম্পর্কিত আইনের ইতিহাস খুব পুরোনো নয়।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (NALSA) সম্পর্কিত একটি রায়ে সর্বপ্রথম ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
এই রায়ে, সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকদের নিজেদের লিঙ্গ-পরিচয় নির্ধারণের অধিকার প্রদান করে। এছাড়াও, আদালত তাদের "তৃতীয় লিঙ্গ" হিসেবে মর্যাদা দেয়। ভারতের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারি রায় বলে গণ্য করা হয়।
আদালত সরকারকে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় তাদের জন্য উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেয়।
এই রায়ের পরে সরকার ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকারের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পাঁচ বছর সময় নেয়।
২০১৯ সালে পাশ হওয়া ট্রান্সজেন্ডার পারসন্স (অধিকার ও সুরক্ষা) বিলটি রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এই আইন অনুসারে, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি বলতে লিঙ্গের স্পেকট্রামের এক বিস্তীর্ণ অংশকে বোঝায়।
এদের মধ্যে তারাও রয়েছেন যাদের লিঙ্গ পরিচয় জন্মের সময় নির্ধারিত দৈহিক পরিচয় থেকে ভিন্ন। এই সংজ্ঞার মধ্যে ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ এবং নারী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য কোনো ব্যক্তির চিকিৎসাগত পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যাওয়া আবশ্যক নয়। এই সংজ্ঞাটি এতটাই বিস্তৃত যে এর মধ্যে জেন্ডারকুইয়ার ও ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের সঙ্গে 'কিন্নর', 'হিজড়া', 'আরাভানি' এবং 'জোগতা'-র মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়সম্পন্ন সম্প্রদায়গুলোও অন্তর্ভুক্ত।
২০১৯ সালের আইনটি নিজের লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণের অধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি রূপান্তরকামী পরিচয়ের জন্য জেলাশাসকের থেকে ট্রান্স-আইডি পাওয়ার একটি প্রক্রিয়াও চালু করে।
সেই সময়ে অনেক ট্রান্সজেন্ডার অধিকার কর্মী এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে যুক্তি দেন যে, এই বিধানটি NALSA সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা 'আত্ম-পরিচয়ের অধিকার'-এর পরিপন্থী।
শুধু তাই নয়, এই আইনের অধীনে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের জন্য নীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি জাতীয় ট্রান্সজেন্ডার পরিষদও গঠন করা হয়েছিল।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Noah SEELAM / AFP via Getty Images
সংশোধনের পিছনে উদ্দেশ্য কী?
সরকারের দাবি, সংশোধনী বিলটির লক্ষ্য শুধুমাত্র জৈবিক কারণে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সাহায্য করা। লোকসভায় উপস্থাপিত বিলটির চূড়ান্ত অংশে সরকার এর উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছে।
সরকার আরও মনে করে যে, ২০১৯ সালের আইনে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির সংজ্ঞা অস্পষ্ট, ফলে যাদের সত্যিই সুবিধা পাওয়া দরকার, তাদের সহায়তা প্রদান করা সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
এই অস্পষ্ট সংজ্ঞা পুলিশ, আদালত এবং ব্যক্তিগত আইন সংক্রান্ত বিধি-বিধান প্রয়োগেও বাধা সৃষ্টি করে।
সরকারের বক্তব্য, আগের আইনটি ভিন্ন লিঙ্গ-পরিচয়ের ব্যক্তি, যারা নিজেদের লিঙ্গ পরিচয় বেছে নেয় অথবা যাদের লিঙ্গ পরিচয় সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় (জেন্ডার ফ্লুইড) তাদের সুরক্ষা দিত না।
কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতেও এই সংশোধনী আনা হয়েছে বলে স্পষ্ট করেছে ভারত সরকার।
সরকারের দাবি, "প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের অপহরণ করে গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের শিকার করা হয়। এছাড়াও, বিভিন্ন উপায়ে তাদের ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় গ্রহণে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এটি করা হয় যাতে পরবর্তীতে ভিক্ষাবৃত্তির মতো কার্যকলাপের মাধ্যমে তাদের আর্থিকভাবে শোষণ করা যায়।"
রূপান্তরকামীদের বড় অংশ এই ধরনের বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই সংশোধনীতে ব্যবহৃত ভাষা রূপান্তরকামীদের সন্দেহভাজন ও অপরাধী হিসেবে দেগে দেওয়ার কাজ করছে।

ছবির উৎস, ANI
কাদের রূপান্তরকামী বলে মানা হবে?
নতুন সংশোধনীটি পুরোনো আইনে উল্লিখিত ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির সংজ্ঞাকে আরও ছোট করেছে।
শুধু তাই নয়, এই সংশোধনীতে ২০১৯ সালের আইনের ধারা ৪(২) অপসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে লিঙ্গ স্ব-শনাক্তকরণের অধিকারের কথা উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ কোনও মানুষ তাঁর লিঙ্গ-পরিচয় কী হবে, তা নিজেই নির্ধারণ করতে পারতেন।
নতুন সংজ্ঞা অনুসারে, কিন্নর, হিজড়া, আরাভানি, বা জোগতা-এর মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়যুক্ত কোনো সম্প্রদায়ের অন্তর্গত যেকোনো ব্যক্তিকেই ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে গণ্য করা হবে।
এই সংজ্ঞার মধ্যে ইন্টারসেক্স ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত। ইন্টারসেক্স বলতে বোঝায়, জন্মগতভাবে যাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যেমন যৌন অঙ্গ, ক্রোমোজোম বা হরমোন, একজন স্বাভাবিক পুরুষ বা নারীর থেকে ভিন্ন।
এছাড়াও যাদের প্রতারণা করে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে সেই শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরাও এই সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত।
তবে নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী 'স্ব-শনাক্তকারী' ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত নন।

ছবির উৎস, ANI
ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়পত্র
২০১৯ সালের আইন অনুযায়ী, যে কেউ সরাসরি জেলাশাসকের থেকে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়পত্র পেতে পারতেন।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, এর জন্য মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট বা প্রধান মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষরিত একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে।
এই সার্টিফিকেটসহ একটি আবেদনপত্র জেলাশাসকের কাছে জমা দিতে হবে। তিনি পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হওয়ার পরেই ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়পত্রটি ইস্যু করবেন।
এছাড়াও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এখন থেকে লিঙ্গ-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার সম্পর্কে সরাসরি জেলাশাসককে তথ্য প্রদান করতে হবে।

ছবির উৎস, Noah SEELAM / AFP via Getty Images
কী বলছেন রূপান্তরকামীরা?
সংশোধনী বিলটি উত্থাপনের পর, এটি প্রত্যাহারের দাবিতে দেশজুড়ে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ দেখা গেছে। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, পুনে এবং হায়দরাবাদ সহ দেশের বিভিন্ন শহরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তারা। প্রতিবাদস্বরূপ সংশোধনী বিলের কপি ছিঁড়ে ফেলেছেন তাঁরা।
রূপান্তরকামীরা বলছেন, এই সংশোধনীটি তাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করবে। এছাড়াও এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের ওপর একটি সরাসরি আঘাত।
কলকাতার ট্রান্সজেন্ডার আন্দোলনকারী অনুরাজ মৈত্রেয়ী বিবিসিকে বলেছেন, "এই আইন চালু হলে মেডিকেল অফিসারের সামনে আমাকে গোপনীয়তা ত্যাগ করতে হবে, এটি লজ্জাজনক।"
কলকাতার কুইয়ার আন্দোলনকারী বলে পরিচিত ডাক্তার ভাস্কর দাস বিবিসিকে জানিয়েছেন, "বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, লিঙ্গ-পরিচয় শুধু দৈহিক নয়, মানসিক ও সামাজিক উভয়েই। এই সংশোধন আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিপন্থী।








