এই রমজানে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হবে কোথায়?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, বিবিসি নিউজ আফ্রিক, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে কোথাও কোথাও গত বুধবার এবং বাংলাদেশসহ কোনো কোনো জায়গায় বৃহস্পতিবার থেকে রমজান মাস শুরু হয়েছে।
ইসলামের অনুসারীদের অনেকে এই মাসে টানা ২৯ থেকে ৩০ দিন প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখবেন।
রমজানের সঠিক তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়, কারণ ইসলামিক ক্যালেন্ডার চাঁদের অবস্থান অনুযায়ী চলে। সাধারণত প্রতি বছর রমজান প্রায় ১১ দিন করে এগিয়ে আসে।
দিনের বেলায় খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পালনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হয়—বিশেষত স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতু কীভাবে রোজার সময়কে প্রভাবিত করে?
বর্তমানে দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল চলছে। ফলে দিনের সময় দীর্ঘ হওয়ায় এখানে রোজার সময়ও বেশি হয়, যা শীতকালের তুলনায় দীর্ঘতর।
উল্টোভাবে, উত্তর গোলার্ধে এখন শীত, তাই এখানে রোজার সময়কাল সেই অঞ্চলে রমজান গ্রীষ্মে পড়লে যে সময় লাগত, তার তুলনায় কম।
এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দিনের দৈর্ঘ্য ভিন্ন হয়—ভূ-মধ্যরেখা থেকে কোনো স্থান যত দূরে, গ্রীষ্মে দিন তত লম্বা এবং শীতে রাত তত বড় হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস—যা প্রায়ই বিশ্বের সর্বদক্ষিণের শহর হিসেবে বিবেচিত—সেখানে এবার রমজানের শুরুতে প্রায় সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা রোজা রাখতে হবে।

ছবির উৎস, Posnov / Getty Images
কিন্তু নরওয়ের লংইয়ারবিয়েন—যা সাধারণত বিশ্বের সর্বউত্তরের শহর বা স্থায়ী বসতি হিসেবে বিবেচিত—সেখানে রমজানের শুরুর সময় রোজা রাখতে হবে আনুমানিক সকাল ১০টা ৫০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ, কেবল আড়াই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় রোজা রাখতে হবে।
দিন বড় হতে থাকলে রমজানের শেষ দিনে সেখানে রোজার সময় দাঁড়াবে সাড়ে ১২ ঘণ্টা।
তবে চরম ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানরা প্রায়ই মক্কার সময় অনুসরণ করেন, যাতে ইফতার বা সেহরির জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া বা রোজা পালন করা কঠিন হয়ে ওঠার মতো পরিস্থিতি এড়ানো যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
বিশ্বের উত্তর গোলার্ধে রমজান যখন প্রায় ২১শে জুনের কাছাকাছি পড়ে তখন সবচেয়ে দীর্ঘ রোজার সময় হয়, আর যখন ২১শে ডিসেম্বরের কাছাকাছি পড়ে তখন সবচেয়ে ছোট সময়ের রোজা হয়।
দক্ষিণ গোলার্ধে এর উল্টোটি ঘটে—রমজান প্রতিবছর ডিসেম্বরের দিকে এগোতে থাকলে রোজার সময় দীর্ঘতর হয়, আর জুনের দিকে এগোলে সময় কমতে থাকে।
বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা কোন কোন সময়ে রোজা রাখবেন?
আরব বিশ্বের বহু অঞ্চলে রোজার সময় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টার মধ্যে থাকবে, যা ২০২৬ সালের রমজানকে সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত মধ্যম-দৈর্ঘ্যের রোজার মৌসুম করে তুলছে।
পবিত্র নগরী মক্কায় রমজানের শুরুতে প্রায় সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে রোজা শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শেষ হবে, অর্থাৎ সাড়ে ১১ ঘণ্টার মতো রোজা রাকতে হবে। মাসের শেষে এ সময় আরও আধ ঘণ্টা বাড়বে।

ছবির উৎস, Saudi Press Agency via Reuters
দক্ষিণ গোলার্ধের বড় বড় জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানদের রোজার সময় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হবে।
উদাহরণস্বরূপ, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে রমজানের শুরুতে রোজা রাখতে হবে ১৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডেও রমজান প্রায় একই দৈর্ঘ্যের রোজার সময় দিয়ে শুরু হবে।

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
উভয় শহরেই পবিত্র মাসের শেষে রোজার সময় প্রায় এক ঘণ্টা কমে যাবে। কারণ সে সময় দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে, ফলে দিনের আলোও কম থাকে।
তবে সর্বউত্তর অঞ্চলে রোজার সময় মাসজুড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হবে। উদাহরণ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ রমজানের শুরুতে রোজার সময় থাকবে প্রায় ৯ ঘণ্টা, যা মাসের শেষে বেড়ে ১২ ঘণ্টারও বেশি হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
এ বছর রোজার সময়টাকে বেশ সহজ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ রমজান জুন বা জুলাইয়ে পড়লে উচ্চ অক্ষাংশের অনেক অঞ্চলে দিনের আলোর সময় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।
নরওয়ে, রাশিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের কিছু অংশে রমজান দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনে পড়লে মুসলমানদের প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘণ্টা রোজা রাখতে হতে পারে।
উত্তর গোলার্ধে এ বছর রোজার সময় গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হবে এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে আরও কমতে থাকবে। ওই বছর রমজান শীতকালে বা ডিসেম্বরে পড়বে।
আর দক্ষিণ গোলার্ধে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর রোজার সময় বাড়তে থাকবে।

ছবির উৎস, EPA
কেন মুসলমানরা রোজা রাখেন?
রমজানে রোজা রাখা ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, যা মুসলমানদের জীবনযাপনের মূল ভিত্তি নির্ধারণ করে। রোজার উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক চর্চাকে উৎসাহিত করা।
মুসলমানরা রোজা শুরুর জন্য ভোরের আগে খাবার খান, যা 'সাহরি' বা 'সুহুর' নামে পরিচিত। দিনের আলো চলাকালে তারা কোনোরূপ খাবার বা পানীয়—এমনকি পানিও—গ্রহণ করতে পারেন না। আর সূর্যাস্তের পর 'ইফতার' বা 'ফিতুর' নামে পরিচিত সন্ধ্যার খাবারের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করেন।
ইসলাম স্বাস্থ্যকে কঠোর আনুগত্যের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে রোজা থেকে কিছু মানুষকে অব্যাহতি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে–– বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো শিশু, গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো নারী, ঋতুমতী নারী, অসুস্থ ব্যক্তি বা যাদের স্বাস্থ্যের ওপর রোজার প্রভাব পড়তে পারে এবং যারা ভ্রমণে আছেন।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত সময়ের উৎস: মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) গ্লোবাল মনিটরিং ল্যাবরেটরি
অতিরিক্ত প্রতিবেদন: সের্জি ফোরকাদা ফ্রেক্সাস, অ্যান্ড্রু ওয়েব এবং ইথার শালাবি

ছবির উৎস, Getty Images








