এই রমজানে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হবে কোথায়?

২১ মার্চ ২০২৫-এ বাংলাদেশে ঢাকায় তিন হাজার রোজাদার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করছেন। ওপর থেকে দেখা যাচ্ছে, তারা লাল কাপড়ে মোড়া লম্বা টেবিলের সারিতে বসে আছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুরো মুসলিম বিশ্ব রমজানের একমাস রোজা পালন করবে
    • Author, বিবিসি নিউজ আফ্রিক, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে কোথাও কোথাও গত বুধবার এবং বাংলাদেশসহ কোনো কোনো জায়গায় বৃহস্পতিবার থেকে রমজান মাস শুরু হয়েছে।

ইসলামের অনুসারীদের অনেকে এই মাসে টানা ২৯ থেকে ৩০ দিন প্রতিদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখবেন।

রমজানের সঠিক তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়, কারণ ইসলামিক ক্যালেন্ডার চাঁদের অবস্থান অনুযায়ী চলে। সাধারণত প্রতি বছর রমজান প্রায় ১১ দিন করে এগিয়ে আসে।

দিনের বেলায় খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পালনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হয়—বিশেষত স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে।

বিশ্ব মানচিত্রের ওপর চিহ্নিত করা হয়েছে কোথায় কত ঘণ্টা রোজা রাখতে হবে

ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতু কীভাবে রোজার সময়কে প্রভাবিত করে?

বর্তমানে দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল চলছে। ফলে দিনের সময় দীর্ঘ হওয়ায় এখানে রোজার সময়ও বেশি হয়, যা শীতকালের তুলনায় দীর্ঘতর।

উল্টোভাবে, উত্তর গোলার্ধে এখন শীত, তাই এখানে রোজার সময়কাল সেই অঞ্চলে রমজান গ্রীষ্মে পড়লে যে সময় লাগত, তার তুলনায় কম।

এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দিনের দৈর্ঘ্য ভিন্ন হয়—ভূ-মধ্যরেখা থেকে কোনো স্থান যত দূরে, গ্রীষ্মে দিন তত লম্বা এবং শীতে রাত তত বড় হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস—যা প্রায়ই বিশ্বের সর্বদক্ষিণের শহর হিসেবে বিবেচিত—সেখানে এবার রমজানের শুরুতে প্রায় সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা রোজা রাখতে হবে।

পুয়ের্তো উইলিয়ামসের একটি এলাকা। উজ্জ্বল দিনে নীল আকাশে মেঘ। রাস্তার শেষে বহু রঙের বাড়ি, পেছনে নীল ঘরবাড়ি পাহাড়ের ঢালে, আরও ওপরে সাদা ও বাদামি বাড়ি। সামনের দিকে ’প্লাজা বার্নার্দো ওহিগিন্স’ লেখা একটি সাইনবোর্ড।

ছবির উৎস, Posnov / Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বের সর্বদক্ষিণের শহর হিসেবে বিবেচিত চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামসে এ বছর প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা লম্বা হবে রোজা

কিন্তু নরওয়ের লংইয়ারবিয়েন—যা সাধারণত বিশ্বের সর্বউত্তরের শহর বা স্থায়ী বসতি হিসেবে বিবেচিত—সেখানে রমজানের শুরুর সময় রোজা রাখতে হবে আনুমানিক সকাল ১০টা ৫০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ, কেবল আড়াই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় রোজা রাখতে হবে।

দিন বড় হতে থাকলে রমজানের শেষ দিনে সেখানে রোজার সময় দাঁড়াবে সাড়ে ১২ ঘণ্টা।

তবে চরম ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানরা প্রায়ই মক্কার সময় অনুসরণ করেন, যাতে ইফতার বা সেহরির জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া বা রোজা পালন করা কঠিন হয়ে ওঠার মতো পরিস্থিতি এড়ানো যায়।

সবুজ, লাল, কমলা এবং হলুদ রঙের ঢালু ছাদের ঘরগুলো বরফে ঢেকে রয়েছে। পেছনে বরফে মোড়া পর্বতের ওপর আরও উঁচুতে একটি স্কি লিফট দেখা যাচ্ছে। আকাশ উজ্জ্বল সাদা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নরওয়ের লংইয়ারবিয়েনে এ বছর রমজান শীতকালে পড়েছে এবং পবিত্র মাসের শুরুর সময় দিনের আলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হবে

বিশ্বের উত্তর গোলার্ধে রমজান যখন প্রায় ২১শে জুনের কাছাকাছি পড়ে তখন সবচেয়ে দীর্ঘ রোজার সময় হয়, আর যখন ২১শে ডিসেম্বরের কাছাকাছি পড়ে তখন সবচেয়ে ছোট সময়ের রোজা হয়।

দক্ষিণ গোলার্ধে এর উল্টোটি ঘটে—রমজান প্রতিবছর ডিসেম্বরের দিকে এগোতে থাকলে রোজার সময় দীর্ঘতর হয়, আর জুনের দিকে এগোলে সময় কমতে থাকে।

বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা কোন কোন সময়ে রোজা রাখবেন?

আরব বিশ্বের বহু অঞ্চলে রোজার সময় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টার মধ্যে থাকবে, যা ২০২৬ সালের রমজানকে সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত মধ্যম-দৈর্ঘ্যের রোজার মৌসুম করে তুলছে।

পবিত্র নগরী মক্কায় রমজানের শুরুতে প্রায় সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে রোজা শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শেষ হবে, অর্থাৎ সাড়ে ১১ ঘণ্টার মতো রোজা রাকতে হবে। মাসের শেষে এ সময় আরও আধ ঘণ্টা বাড়বে।

২১শে এপ্রিল ২০২৩-এ মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদে মুসলমানরা ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করছেন। সাদা পোশাক পরিহিত মানুষরা কাবার চারদিকে অবস্থান করছেন। তাদের চারপাশে বিভিন্ন রঙের পোশাক পরা নারীরাও রয়েছেন।

ছবির উৎস, Saudi Press Agency via Reuters

ছবির ক্যাপশান, রমজান মাস শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে বহু মুসলমান মক্কায় আসেন

দক্ষিণ গোলার্ধের বড় বড় জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানদের রোজার সময় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ হবে।

উদাহরণস্বরূপ, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে রমজানের শুরুতে রোজা রাখতে হবে ১৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডেও রমজান প্রায় একই দৈর্ঘ্যের রোজার সময় দিয়ে শুরু হবে।

৩০শে মার্চ ২০২৫-এ কয়েকজন পুরুষ ও নারী আরবীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নীল পরিষ্কার আকাশের নিচে ঘাসের লনে বসে খাবার খাচ্ছেন। পেছনে আরও লোকজন দাঁড়িয়ে আছেন এবং কয়েকজন শিশু ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। উজ্জ্বল রোদেলা দিনে পেছনে উঁচু টাওয়ার ব্লক দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২৫ সালের রমজান শেষে বুয়েন্স আয়ার্সে মুসলমানরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন একসঙ্গে খাবার খেয়ে এবং শিশুদের খেলাধুলার আয়োজনের মাধ্যমে

উভয় শহরেই পবিত্র মাসের শেষে রোজার সময় প্রায় এক ঘণ্টা কমে যাবে। কারণ সে সময় দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে, ফলে দিনের আলোও কম থাকে।

তবে সর্বউত্তর অঞ্চলে রোজার সময় মাসজুড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হবে। উদাহরণ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ রমজানের শুরুতে রোজার সময় থাকবে প্রায় ৯ ঘণ্টা, যা মাসের শেষে বেড়ে ১২ ঘণ্টারও বেশি হবে।

গোধূলির সময় লাল প্রাকৃতিক আলোয় ভেসে থাকা তুষারাচ্ছন্ন রাস্তায় একটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। সে শীতের পোশাক পরেছে এবং তার পাশে দড়ি বাঁধা একটি বোঝা পড়ে আছে। পেছনে ঘরবাড়ি এবং একটি স্ট্রিটলাইট দেখা যাচ্ছে। আকাশ অন্ধকার।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকে রমজানজুড়ে রোজার সময় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়বে

এ বছর রোজার সময়টাকে বেশ সহজ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ রমজান জুন বা জুলাইয়ে পড়লে উচ্চ অক্ষাংশের অনেক অঞ্চলে দিনের আলোর সময় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

নরওয়ে, রাশিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের কিছু অংশে রমজান দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনে পড়লে মুসলমানদের প্রতিদিন প্রায় ২০ ঘণ্টা রোজা রাখতে হতে পারে।

উত্তর গোলার্ধে এ বছর রোজার সময় গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হবে এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে আরও কমতে থাকবে। ওই বছর রমজান শীতকালে বা ডিসেম্বরে পড়বে।

আর দক্ষিণ গোলার্ধে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর রোজার সময় বাড়তে থাকবে।

ইয়েমেনের সানার একটি বাজারে রমজান উপলক্ষে সোনালি আলো ও সজ্জা। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি মসজিদের ছবির ওপরে “রমজান মুবারক” লেখা রয়েছে, যার ওপরে দৃশ্যমান একটি চাঁদ। সামনের দিকে একটি সাদা অর্ধচন্দ্রের আউটলাইন দেখা যাচ্ছে। আশপাশে ঝুলছে কয়েকটি সোনালি তারকা।

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, রমজান মাসে মুসলমানরা প্রতিদিন ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ২৯ বা ৩০ দিন রোজা রাখেন

কেন মুসলমানরা রোজা রাখেন?

রমজানে রোজা রাখা ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি, যা মুসলমানদের জীবনযাপনের মূল ভিত্তি নির্ধারণ করে। রোজার উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক চর্চাকে উৎসাহিত করা।

মুসলমানরা রোজা শুরুর জন্য ভোরের আগে খাবার খান, যা 'সাহরি' বা 'সুহুর' নামে পরিচিত। দিনের আলো চলাকালে তারা কোনোরূপ খাবার বা পানীয়—এমনকি পানিও—গ্রহণ করতে পারেন না। আর সূর্যাস্তের পর 'ইফতার' বা 'ফিতুর' নামে পরিচিত সন্ধ্যার খাবারের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করেন।

ইসলাম স্বাস্থ্যকে কঠোর আনুগত্যের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে রোজা থেকে কিছু মানুষকে অব্যাহতি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে–– বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো শিশু, গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ানো নারী, ঋতুমতী নারী, অসুস্থ ব্যক্তি বা যাদের স্বাস্থ্যের ওপর রোজার প্রভাব পড়তে পারে এবং যারা ভ্রমণে আছেন।

অতিরিক্ত প্রতিবেদন: সের্জি ফোরকাদা ফ্রেক্সাস, অ্যান্ড্রু ওয়েব এবং ইথার শালাবি

৩০ মার্চ ২০২৫-এ দিল্লির জামে মসজিদের সোনালি গম্বুজের পেছনে ঈদুল ফিতরের আগের সন্ধ্যায় আকাশে দেখা যাচ্ছে অর্ধচন্দ্র। আকাশ গাঢ় নীল এবং চাঁদ পাতলা বাঁকা, যেন পেছনদিকে হেলে রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images