আর জি কর আন্দোলন থেকে পানিহাটি কেন্দ্রের লড়াইয়ে মুখোমুখি তিন জন

ছবির উৎস, Asian News International
- Author, ময়ূরী সোম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
'অভয়ার রক্ত হবে নাকো ব্যর্থ' — পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির প্রচারে শোনা যাচ্ছে এই স্লোগান।
২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে একজন তরুণী চিকিৎসক উত্তর কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নির্যাতন ও খুনের শিকার হয়েছিলেন। তার নাম প্রকাশ না করে তাকে 'অভয়া' বলে ডাকা হয়।
'অভয়া' ছিলেন পানিহাটির বাসিন্দা। দীর্ঘদিন তার ন্যায়বিচারের দাবিতে পশ্চিমবঙ্গের রাস্তায় আন্দোলন চালিয়েছিলেন রাজ্যের সাধারণ মানুষ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
এই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর, পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে, পানিহাটি কেন্দ্রটি রাজ্যের অন্যতম আলোচিত আসন হয়ে উঠেছে।
যেই ঘটনার প্রতিবাদে রাজ্যজুড়ে মানুষ পথে নেমেছিলেন, আজ সেই আন্দোলনের সাথে কোনো না কোনোভাবে 'যুক্ত' তিনজন প্রার্থী পানিহাটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়ছেন।
পানিহাটি কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী
পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে লড়ছেন নির্যাতনের শিকার 'অভয়া'র মা, রত্না দেবনাথ।
অভয়ার মৃত্যুর পর থেকে, তার মাতা-পিতা বিরামহীনভাবে তাদের মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, রাজ্য পুলিশ ঘটনাটির সঠিক তদন্ত করেনি।
কলকাতা পুলিশের আটক করা সিভিক পুলিশ ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে নিম্ন আদালত দোষী সাব্যস্ত করলেও, অভয়ার পরিবারের দাবি, আরো অনেকে তাদের মেয়ের নির্যাতন ও খুনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তাদের আরো অভিযোগ, অন্য সন্দেহভাজনদের নাম চার্জশিটে উল্লেখ করেনি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই বা কলকাতা পুলিশ।
২৫শে মার্চ প্রকাশিত বিজেপির তৃতীয় দফার প্রার্থী তালিকায় পানিহাটি কেন্দ্রে অভয়ার মায়ের নামের উল্লেখ রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
পানিহাটির আগরপাড়া অঞ্চলে মিজ. দেবনাথ প্রচারণা চালাতে চালাতে বিবিসিকে বললেন, "আমি কোনদিনও ভাবিনি (নির্বাচনে লড়ব)। আমার একটা সুন্দর মেয়ে ছিল।"
"সে এতো সুন্দর ছিল, তার হাত ধরলে ভাবতাম আমি গোটা পৃথিবীর সব চেয়ে ভালো মা। সে হারিয়ে গিয়ে … আমার কাছে সব আছে কিন্তু আমার মনে হয় আমিই সব থেকে দুঃখী মা।"
অশ্রু মুছতে মুছতে তিনি আরো বলেন, "আমার তো আর সংসার বলতে কিছু নেই, ঘরটা আমার শূন্যই। তো আমরা দুজন মিলে সমাজ সেবাই করব। মেয়েটা যে লড়াই করতে নেমেছিল, তার লড়াইটা অনেক বেশি ছিল।"
অন্য কেন্দ্রের মতো পানিহাটিতে বিজেপির প্রচারে 'জয় শ্রী রাম' আর 'ভারত মাতা কি জয়' –এর মতো স্লোগানের পাশাপাশি চলছে ২০২৪ সালের আর জি কর আন্দোলেনের স্লোগানও।

অভয়ার মায়ের অভিযোগ, পানিহাটির 'অভিভাবক' তথা তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক নির্মল ঘোষ তার মেয়ের ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছিলেন।
বিজেপির প্রচারে পার্টির সমর্থকদের মুখে শোনা যাচ্ছে এমনও স্লোগান যা তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নারীকেন্দ্রিক প্রকল্প কে কটাক্ষ করছে — 'লক্ষ্মীর ভান্ডার কী হবে, লক্ষ্মী যদি না থাকে'; 'কন্যাশ্রী কী হবে, কন্যা যদি না থাকে!'
মিজ. দেবনাথের কাছে পানিহাটির প্রধান সমস্যা রাস্তায় জমে থাকা জল। তিনি বললেন, "চারিদিকে জল, আমি তো কত জায়গায় যেতেই পারিনি। আমি অতটা জল ভেঙে যেতে পারিনি। ড্রেনের জল আর রাস্তার জল একাকার হয়ে গেছে।"
মিজ. দেবনাথের নির্বাচনে লড়া নিয়ে নামকরা চিকিৎসক ও আর জি কর আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ডঃ সুবর্ণ গোস্বামী বলছেন, "আমাদের আন্দোলন সেই সময় ছিল সিস্টেমিক অবিচারের বিরুদ্ধে, কেবল অভয়ার ন্যায়বিচারের দাবিতে নয়। অতএব অভয়ার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচিতি আমাদের আন্দোলনের উপর কোনোরকম প্রভাব ফেলবে না। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।"
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর আর জি কর যোগ কী?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
অভয়ার মায়ের বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন তীর্থঙ্কর ঘোষ, পানিহাটির বর্তমান বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র।
আর জি করের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে তিনি নির্যাতিতার মৃতদেহ তাড়াতাড়ি দাহ করার চেষ্টা করেছিলেন।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই তাকে এই ধর্ষণ ও খুনের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল।
দিনের প্রচার শুরু করার আগে তার পরিবারের বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে পানিহাটির তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ বিবিসিকে বলেন, "বিজেপি যদি কিছু বলে থাকে তাহলে বিজেপির ভাবা উচিত যে সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট আর শিয়ালদহ আদালতে মামলা এখনো চলছে।"
"ওখানে মহামান্য বিচারপতিরা আছেন। তারা বিচারব্যবস্থার মধ্যে থেকে এই বিচারাধীন কেসে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা বলুক।"
তার প্রতি পানিহাটির মানুষের সমর্থন সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করলেন মি. ঘোষ। তিনি বলেন, "পানিহাটির মানুষ, পানিহাটির নির্বাচন কেন হয়, বিধায়ক কেমন হওয়া উচিত, পানিহাটি এলাকায় কী করে উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব এগুলো তাদের ক্লিয়ার কনসেপ্ট আছে।"
তার মতে, নির্বাচন প্রক্রিয়া আর আর জি কর আন্দোলনকে কখনোই "এক করা উচিত নয়"।
পানিহাটির ঘোলা এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচার পদযাত্রায় প্রার্থী এবং তার সমর্থকদের সাথে ছিলেন নারী ঢাকিরা।
প্রচারের সময় এলাকার কয়েকজন নারী প্রার্থীকে মালা পরাচ্ছিলেন, অনেকেই হাসিমুখে বলছেন, "আমরা ভালোই আছি।"
কিন্তু এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, এই অঞ্চলে নর্দমার জল খুব সহজেই রাস্তায় উঠে আসে আর জমে থাকা বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যায়। তার সাথে মশার উপদ্রব এবং ভাঙাচোরা রাস্তাও তাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে।
বিবিসিকে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে এলাকার একজন বাসিন্দা বলছিলেন, "কিছুদিন আগে, বর্তমান বিধায়ক আর পৌরপিতার কল্যাণে এখানকার কয়েকটি রাস্তা মেরামত হয়েছে। তবে সেটা নির্বাচনের জন্য না সত্যিই আমাদের ভালোর জন্য, তা আমাদের জানা নেই।"

পানিহাটির বামপন্থী প্রার্থীও ছিলেন আর জি কর আন্দোলনে
অপর দিকে, পানিহাটি কেন্দ্রে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট) বা সিপিআইএমের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বামফ্রন্টের সুপরিচিত যুবনেতা কলতান দাশগুপ্ত।
আর জি করে নির্যাতনের শিকার তরুণীর জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, মি. দাশগুপ্ত তাতে একজন অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।
পানিহাটির নামকরা পিয়ারলেস নগর আবাসনে প্রচার করতে করতে বিবিসিকে উনি বলছিলেন, "আমরা ব্যক্তিগতভাবে তো কেউ এই আন্দোলন করিনি। হাজার হাজার মানুষ একসাথেই আন্দোলন করেছিলেন।"
"যখন তারা আন্দোলন করেছিলেন, তখন কেউ জানতেন না কে তৃণমূল, কে বিজেপি, কে কী।"
তিনি আরো বলেন, "এই ইন্টারভিউ চলাকালীনও যদি আবার আমরা (এরকম কোনো ঘটনার) খবর পাই, আবার আমরা এই আন্দোলনে যাব। যেমন হাথরাস, উন্নাও-এর (সেখানকার ধর্ষণের) ঘটনার বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি, তেমনি এই ঘটনায় বা এর পরবর্তী যে কোনো ঘটনায় আমরা যাব। এটাই আমাদের নীতি।"
মি. দাশগুপ্তর মতে পানিহাটি কেন্দ্রে তার লক্ষ্য থাকবে পরিস্রুত পানীয় জল নিশ্চিত করা, অমরাবতীর খেলার মাঠ রক্ষা করা, নারী নিরাপত্তায় নজর রাখা, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষের ভরসা ফেরানো আর শিল্পের জমিতে শিল্প ফেরানো।








