আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশে পেপ্যাল সার্ভিস চালু নিয়ে আলোচনা, কী সুবিধা আর কী ঝুঁকি
- Author, মরিয়ম সুলতানা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ডিজিটাল লেনদেনে বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম পেপ্যাল বাংলাদেশে চালু হতে যাচ্ছে, এমন আলোচনা নতুন করে সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই অনলাইন পেমেন্ট, ফ্রিল্যান্স আয়ের অর্থ গ্রহণ কিংবা আন্তর্জাতিক কেনাকাটায় ব্যবহৃত হয় এ সেবা। কিন্তু বাংলাদেশে এটি এখনো চালু হয়নি।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই পেপ্যাল চালুর দাবি ছিল। বিভিন্ন সময় এ নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার খবরও শোনা গিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি।
সর্বশেষ ২২শে এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে 'পেপ্যাল' চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু পেপ্যাল আসলে কী? কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, আর এ সেবা চালু হলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কোন কোন কাজে আসবে - এমন নানা প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।
পেপ্যাল কী, কীভাবে কাজ করে?
পেপ্যাল মূলত মার্কিন মালিকানাধীন বহুজাতিক আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
এটি একটি অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা ব্যবহারকারীদের অনলাইনে নিরাপদে অর্থ আদান-প্রদান ও কেনাকাটার জন্য জনপ্রিয় ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম হিসেবে পরিচিত।
সহজ করে বললে, এটি একটি ই-পেমেন্ট সিস্টেম বা অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা।
এটি এক ধরনের ভার্চুয়াল ওয়ালেট হিসেবে কাজ করে, যেখানে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড যুক্ত করে টাকা পাঠানো, গ্রহণ ও কোন কিছু কিনলে তা মূল্য পরিশোধ করা যায়।
বিশ্বে পেপ্যালের মতো আরও কিছু প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। যেমন- স্ট্রাইপ, পেওনিআর ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিকাশ ও পেপ্যাল একই ধরনের আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এর ব্যবহার ও পরিসর এক নয়।
বিকাশের সেবা কেবল বাংলাদেশের ভেতরে লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
আর পেপ্যাল ব্যবহৃত হয় ক্রস-বর্ডার, মানে সীমানা পেরিয়ে অর্থাৎ এক দেশে বসে পণ্য কিনে অন্য দেশ থেকে তার মূল্য পরিশোধ করা যায় পেপ্যালের মাধ্যমে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, বিকাশের সাথে পেপ্যালের মিল থাকলেও পার্থক্যও রয়েছে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, "বিকাশ দিয়েও পে (মূল্য পরিশোধ) করা যায়। তবে পার্থক্য হচ্ছে, এটা দিয়ে বিশ্বব্যাপী আপনি পে করতে পারছেন না। আর ডিজিটাল সিস্টেম আস্থার ওপর চলে। পেপ্যাল যেহেতু দু'শোর বেশি দেশে আছে এবং অনেক মুদ্রায় লেনদেন হয়, তাই সবাই একে চিনে। সেজন্য আন্তর্জাতিক ট্র্যানজেকশনগুলো মানুষ পেপ্যাল দিয়ে করে।"
পেপ্যালের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা তাদের ইমেইল অ্যাড্রেসের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারেন, বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পণ্য বা সেবা কেনাকাটাও করতে পারেন এবং এক্ষেত্রে তাকে তৃতীয় কোনো প্ল্যাটফর্মে তার ব্যাংক বা কার্ডের বিস্তারিত তথ্য সরাসরি শেয়ার করতে হয় না।
কেবল একটিমাত্র প্ল্যাটফর্ম থেকেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহজে অর্থ আদান-প্রদান করা যায় বলে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পেপ্যাল বিশ্বব্যাপী খুবই জনপ্রিয়।
পেপ্যাল কাদের বেশি কাজে আসবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা আন্তর্জাতিক লেনদেন বেশি করেন, এটি তাদের বেশি কাজে আসবে। তবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন ফ্রিল্যান্সার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী এবং দেশের সফটওয়্যার ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের সংগঠন বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, "বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের অনেকে টাকা রিসিভ করতে পারেন না। কারণ অনেক বিদেশি ক্লায়েন্ট পেপ্যালের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে চায়, যেহেতু পেপ্যালের মাধ্যমে করলে তার কিছু সিকিউরিটি আছে।"
"পেপ্যালে ইন্স্যুরেন্স আছে। কোনো কারণে যদি সমস্যা হয়, পেপ্যাল তাকে টাকা ফেরত দেয়। এখন পেপ্যাল এলে ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
অধ্যাপক মইনুল হোসেনও মনে করেন, ফ্রিল্যান্সারদের মত যারা আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ লেনদেন করে, এটা তাদের বেশি কাজে লাগবে।
"কারণ তারা দেশের বাইরে কাজ করে। তাদের অর্থ লেনদেন করতে হয়। এখন তারা পে ইউনিয়ন ও ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, যাতে খরচ বেশি পড়ে এবং সময়ও বেশি লাগে। আর পেপ্যাল হলো ইন্সট্যান্ট (তাৎক্ষণিক লেনদেন হয়), অ্যাকাউন্টে সাথে সাথে টাকা জমা হয়ে যাবে।"
এতে একদিকে ফ্রিল্যান্সাররা কম খরচে সরাসরি পারিশ্রমিক পাবেন, অপরদিকে ক্লায়েন্টদের সাথে তাদের কাজ করাটাও অনেকটা সহজ হয়ে উঠবে।
এছাড়া, বিদেশিরা বাংলাদেশে বেড়াতে বা কাজে এলে, বা অনলাইনে বাংলাদেশের পণ্য কিনতে গেলে অনেকসময় তারা ক্রেডিট কার্ডের পরিবর্তে পেপ্যালে পেমেন্ট করতে চান।
কিংবা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে যারা বিদেশ থেকে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করতে চান, তাদের জন্যও পেপ্যালের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সুবিধা হবে বলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সেইসাথে তারা আরো বলছেন, পেপ্যাল চালু হলে প্রবাসীরাও বাংলাদেশে সহজে ও দ্রুত টাকা পাঠাতে পারবেন।
পেপ্যালের মাধ্যমে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি দেওয়াটাও সহজ, কিন্তু ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দিতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা যায়।
পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে ছিলেন, এমন একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সোনিয়া আলম। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে এবং সম্প্রতি তিনি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে একটি অনলাইন কোর্স কিনেছেন।
সেই কোর্সের ফি তিনি পেপ্যালের মাধ্যমেই পরিশোধ করেছেন।
বাংলাদেশে এখনো পেপ্যাল চালু হয়নি, তাহলে তিনি দেশে বসে পেপ্যাল ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ কীভাবে করলেন?
মিজ আলম জানিয়েছেন, এর কারণ তার পেপ্যাল অ্যাকাউন্টে যুক্তরাজ্যের একটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করা।
কিন্তু তিনি তার ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার না করে পেপ্যাল অ্যাকাউন্ট কেন ব্যবহার করলেন, জানতে চাইলে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সিকিউরিটির কারণে। আর এটা খুব ইজি।"
তিনি জানান, পেপ্যাল দিয়ে কেনাকাটা করতে গেলে বা কাউকে টাকা পাঠাতে গেলে ব্যবহারকারীকে নতুন করে তার অ্যাকাউন্টের নাম, নম্বর, রাউটিং নম্বর বা ক্রেডিট কার্ডের নম্বর, মেয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ডেটা দিতে হয় না।
তিনি তার ফোন নম্বর বা ই-মেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করেই সব লেনদেন করতে পারবেন। কারণ পেপ্যাল অ্যাকাউন্ট তৈরি করার সময়ই তাকে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ডের সঙ্গে পেপ্যালকে সংযুক্ত করে নিতে হয়।
পেপ্যালের অসুবিধা কী এবং ঝুঁকি কোথায়?
পেপ্যালের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, বিশ্বের দুইশোর বেশি দেশে এ সেবা চালু রয়েছে।
পেপ্যালের সেবা নিয়ে যেসব অভিযোগের কথা জানা যায়, তার অন্যতম হলো - ফিশিং মেইল, অর্থাৎ ভুয়া বা প্রতারণামূলক মেইল।
এ ধরনের মেইলের মাধ্যমে প্রতারক বা হ্যাকাররা গ্রাহকের জরুরি বিভিন্ন তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে, অ্যাকাউন্ট বা ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ইন্সুইরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্টের আইটি কনসালট্যান্ট মো. শফিউদ্দিন রাসেল মনে করেন, এগুলো নতুন কিছু না।
"সচেতনতা থাকলে এ ঝুঁকি এড়িয়ে চলা যায়। ফিশিং মেইল আরও অনেক চ্যানেল ধরেই আসতে পারে। এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) আসার পর এগুলো আরও বেড়েছে। এজন্য দরকার জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়ানো।"
"আমাদের দেশে টাকা এলে তো সমস্যা নাই। সাধারণত পেপ্যালে অল্প পরিমানে অর্থ পাঠানো হয়। সমস্যা হবে রেগুলেটরিতে। অর্থাৎ, কেউ পেপ্যাল টু পেপ্যাল ট্র্যানজেকশন করলে তা সরকারের মনিটরিংয়ের বাইরে থাকবে। সরকারের কনসার্নও (চিন্তার কারণ) মেবি এটা।"
এছাড়া অনলাইন বা ডিজিটাল ট্র্যানজেকশন নিয়ে যাদের খুব একটা জানাশোনা নেই, তাদের জন্য এটি ব্যবহার করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে বলছেন ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের হেড অব ইনফরমেশন সিস্টেম অডিট রাশেদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে চালু করতে হলে পেপ্যালকে কোনো একটি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
"এখন এটা ব্যাংক করবে, নাকি থার্ড পার্টি করবে - এটা ঠিক করতে হবে। এখানে একটা গাইডলাইন আসতে হবে যে কীভাবে প্রসেস করবে, সেটেলমেন্ট হবে। এগুলো না করে এটা চালু করা কঠিন," বলছিলেন তিনি।
তার ব্যাখ্যায়, পেপ্যাল অ্যাকাউন্টের মালিক কে, কী ধরনের গ্রাহক তিনি, তার আয়ের উৎস কী, তিনি কোথায় ও কার কাছে টাকা পাঠাচ্ছেন, এরকম কিছু তথ্য উন্মুক্ত থাকতে হবে।
তিনি এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন।
"রেগুলেট করতে না পারলে কেউ যে কোনো অ্যামাউন্টের টাকা পাঠাতে পারবে। তখন মানি লন্ডারিং ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাবে," যোগ করেন তিনি।
তবে ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেপ্যালের মত অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থার আরেকটি ঝুঁকির দিক হচ্ছে, গ্রাহকেরা প্রতারণার শিকার হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে সংস্থা মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধে কাজ করে, সেই বিএফআইও তারা ২৪/৭ মানে সার্বক্ষণিক সেবা দিতে পারে না।
ফলে প্রতারণা শিকার হলে প্রতিকার পাবার ব্যবস্থা কী এবং কত দ্রুত সময়ের মধ্যে তা হবে - তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।