'গুপ্ত' ইস্যুতে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, পুরোনো সংস্কৃতিই কি ফিরছে শিক্ষাঙ্গনে?

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে একটি কলেজে গ্রাফিতিতে 'গুপ্ত' শব্দ লেখা নিয়ে মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর দুই সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।

চট্টগ্রামে সরকারি সিটি কলেজের ওই ঘটনার প্রতিবাদে পরস্পরকে দায়ী করে আজ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।

"সংঘাত, সহিংসতা ও উত্তেজনার সূচনা করছে ছাত্রদল। আমরা সহনশীলতা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম।

আর ছাত্রদল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে 'উত্তেজনাকর' পরিস্থিতির জন্য শিবিরকে দায়ী করেছে।

"এখনকার পরিস্থিতির মূল কারণ হলো শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী বেশে হল ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এটা আমরা মেনে নেবো না," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেকেই ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি সামনে আনেন। তাদের কেউ কেউ এর আগে ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রচার আছে।

শিবিরের কেউ কেউ আবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার জন্যও পরিচিত ছিলেন। দলীয় পরিচয় প্রকাশ্যে না আনার এই বিষয়টিকে রাজনীতিতে নানা সময় আলোচনার বিষয়বস্তু করেছেন অনেকে।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে কী হয়েছে

চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজের একটি দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতে 'গুপ্ত' শব্দটি লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে মঙ্গলবার দিনে দুই দফায় সংঘর্ষ হয়।

সংঘর্ষের যেসব ছবি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে তাতে কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোটা দেখা গেছে।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, দুই দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় সশস্ত্র ব্যক্তিদের সেখানে দেখা গেছে।

জানা গেছে, কলেজের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে লেখা ছিল 'ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস'। সেখানে ছাত্ররাজনীতি থেকে ছাত্র শব্দ মুছে দিয়ে তার উপরে গুপ্ত শব্দ লিখে দেওয়া হয়। এ নিয়েই সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা।

সকাল ১০টার দিকে শুরু হয়ে বিকেল পর্যন্ত গড়ানো সংঘর্ষের এ ঘটনা ওই দিনই জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেন, একটি সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা "সাধারণ ছাত্রদের সমাবেশে আক্রমণ করে একজনের পা কেটে ফেলেছে"।

তিনি এসময় অভিযোগ করেন যে সিটি কলেজের পাশ্ববর্তী এলাকার অস্ত্রধারীরা 'সাধারণ ছাত্রদের' ওপর আক্রমণ করেছে।

"গত ২৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহাসমাবেশে যারা আক্রমণ করেছিল, তারাই আজকে সিটি কলেজে আক্রমণ করেছে," বলেছেন তিনি।

অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রশিবির সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, "চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবিরের জনশক্তির ওপর এক ন্যক্কারজনক ও বর্বরোচিত হামলা চালায় ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা"।

রাতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রশিবির এ ঘটনার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করে বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

অন্যদিকে সংসদে শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনার তদন্ত না করে কাউকে দোষারোপ না করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে, একটা নিউজ বের হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা জানতে তার একটু সময় লাগবে। "তবে একতরফা ব্লেম আমি যেমন দিতে চাই না, মাননীয় সদস্যেরও উচিত না কোনো তদন্ত ছাড়া একটা রাজনৈতিক দলের ওপর আক্রমণ হয়েছে ইত্যাদি বলা"।

কিন্তু এর মধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রদল চট্টগ্রামের ঘটনায় শিবিরকে দায়ী করে মিছিল সমাবেশে করেছে।

শিক্ষাঙ্গনে পুরোনো সংস্কৃতি ফেরার লক্ষণ?

বাংলাদেশে এর আগে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ বা সহযোগী ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস ও হল দখল করার নানা অভিযোগ ছিল। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে থাকা সংগঠনেরও হল দখল করার উদাহরণ আছে।

আর এসব দখল ও নিয়ন্ত্রণের জেরে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র সংঘাত ও বন্দুকযুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।

এখন চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সহিংসতার ঘটনার পর ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে আবারো হল-ক্যাম্পাস-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে রাখার রাজনীতি আলোচনায় আসছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর ছাত্রলীগ না থাকায় এখন ছাত্রদলের সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামী ছাত্রশিবির।

সম্প্রতি রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন দুটির মধ্যকার বিরোধে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে শিবির তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, যা ছাত্রদলকে কিছুটা বিপাকে ফেলেছে বলেও অনেকে মনে করেন।

আবার রাজনীতির অনুমতি নেই এমন কিছু প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে শিবির কর্মীরা রাজনীতি করে এমন অভিযোগও আছে।

তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যারা প্রকাশ্যে এসেছেন তাদের অনেকে আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। এটিকে কেন্দ্র করেই 'গুপ্ত' শব্দটি আলোচনায় এসেছে। যদিও শিবির বলছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে এমন 'ট্যাগিং' দিচ্ছে ছাত্রদল।

ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সভাপতির বক্তব্য

ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব শিক্ষাঙ্গনে চলমান অস্থিরতার জন্য ছাত্রশিবিরকেই দায়ী করছেন। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রামে শিবির কর্মীরাই ছাত্রদলের ওপর হামলা চালিয়েছে।

"আমরা হল বা ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি না। বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেশে শিবিরই হল দখল ও ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে করতে চাইছে। তারাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফরম দখল করে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। বুয়েট থেকে শুরু করে গ্রামের কলেজ পর্যন্ত একই চিত্র," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তিনি বলেন, "এখনকার পরিস্থিতির মূল কারণই হলো শিবিরের গুপ্ত রাজনীতি। তারা তাদের সব কমিটির সবার পরিচয় প্রকাশ করুক। এটি না করলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে না। সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানো আমরা মেনে নিবো না"।

অন্যদিকে ছাত্রশিবির সভাপতি নূরুল ইসলাম বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতার দায় ছাত্রদলের এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন না পেয়ে ছাত্রদল হল ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

"এ কারণেই পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। তারা চট্টগ্রাম ব্যানার নামিয়েছে। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে। আমাদের ওপর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে। সংঘর্ষ এড়াতে আমরা পাল্টা কর্মসূচি দেইনি। আমাদের কর্মসূচিতে বিপুল শিক্ষার্থী অংশ নেয়। কিন্তু ছাত্রদলের তো কোনো সমর্থন নেই," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

মি. ইসলাম বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তারা ট্যাগিং দেয় এবং ছাত্রদলের গ্রহণযোগ্যতা নেই বলেই তারা এখন শক্তি প্রদর্শন করতে চাইছে।

তবে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির দুটি সংগঠনই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ছাড়াও কর্মসূচিও পালন করছে।