'কোনো মানুষ কখনো দেখেনি' এমন দৃশ্য দেখার কথা জানালেন আর্টেমিস ২ এর নভোচারীরা

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

"আমরা এমন সব দৃশ্য দেখেছি, যা আগে কোনো মানুষ দেখেনি—এমনকি অ্যাপোলো অভিযানের সময়ও নয়। আমাদের জন্য তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর"– ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই প্রশ্নের জবাবে আর্টেমিস ২ এর নভোচারী কমান্ডার রিড উইসম্যান এই কথা বলেন।

ট্রাম্প জানতে চেয়েছিলেন- "এই ঐতিহাসিক দিনের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অংশ কোনটি?"

সেই প্রশ্নেই এই কথা জানান উইসম্যান।

পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়লেন আর্টেমিস-২ এর নভোচারীরা।

সোমবার গ্রিনিচ মান মন্দিরের সময় বিকেল তিনটা ৫৮ মিনিটে চার নভোচারী চাঁদের পেছন দিকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায়টিতে পৌঁছান।

তখন পৃথিবী থেকে তারা প্রায় চার লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কিলোমিটার বা দুই লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে অবস্থান করছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।

এর আগে মহাকাশে এত দূরে কোনো মানুষ যেতে পারেনি। নতুন এই রেকর্ড গড়ার সময় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নভোচারীরা।

প্রায় ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর পুনরায় সংযোগটি স্থাপিত হয়।

এসময় পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়ার জন্য নভোচারীদের অভিনন্দন জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

পুনরায় সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পর নভোচারীদের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেন তিনি। জানতে চান, কেমন ছিল পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিজ্ঞতা।

"হঠাৎ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর আপনাদের কেমন লাগছিল?," প্রশ্ন করেন ট্রাম্প।

জবাবে চার নভোচারীর একজন ভিক্টর গ্লোভার বলেন, সংযোগ চলে যাওয়ার পর তিনি "কিছুক্ষণ প্রার্থনা" করেছিলেন। কিন্তু তখনও চাঁদের দূরবর্তী অংশের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করা লেগেছিল বলে জানান।

"আমরা এখানে বেশ ব্যস্ত ছিলাম এবং কঠোর পরিশ্রম করছিলাম। আর বলতেই হয়, ব্যাপারটা আসলে বেশ ভালোই ছিল," ট্রাম্পকে বলেন গ্লোভার।

উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৭০ সালের এপ্রিলে নাসার অ্যাপোলো-১৩ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন।

ওই সময় তারা পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা প্রায় দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে ভ্রমণ করেছিলেন।

এতদিন সেটাই ছিল পৃথিবী থেকে মহাকাশের সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় মানুষের যাওয়ার রেকর্ড।

সোমবার সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন আর্টেমিস-২ এর চার নভোচারী।

আর্টিমিসের সকল নভোচারীর উদ্দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলে, "আপনারা যা করছেন, এর আগে মানুষ সত্যিই এ ধরনের কিছু দেখেনি। এটা সত্যিই বিশেষ কিছু।"

চার নভোচারীসহ চন্দ্রাভিযানের সঙ্গে যুক্ত নাসার পুরো দলকে পুনরায় অভিনন্দন জানান ট্রাম্প।

সেইসঙ্গে, মিশন শেষ করে পৃথিবীতে ফেরার পর নভোচারীদের হোয়াইল হাউসে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি।

'ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব'

আর্টেমিস–টু অভিযানের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার পৃথিবীতে থাকা দলের সদস্যদের বলেছেন, চারজন মহাকাশচারী যা দেখছেন, তা "সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন"।

তিনি বলেন, "আমি জানি, এই পর্যবেক্ষণের কোনো বৈজ্ঞানিক মূল্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু আমি সত্যিই আনন্দিত যে আমরা পহেলা এপ্রিল উৎক্ষেপণ করেছি। কারণ মানুষ সম্ভবত এখনো এমন কিছু দেখার জন্য বিবর্তিত হয়নি, যা আমরা দেখছি।"

কমান্ডার রিড উইসম্যান তখন নিজের পর্যবেক্ষণের কথা যোগ করেন। তিনি বলেন,

"এটা একেবারেই বর্ণনাতীত। আমরা যতক্ষণই এর দিকে তাকিয়ে থাকি না কেন, আমাদের মস্তিষ্ক সামনে থাকা এই দৃশ্যটি ঠিকমতো প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে না। এটি একেবারেই বিস্ময়কর, পরাবাস্তব… কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়।"

"নতুন কিছু বিশেষণ তৈরি করতে হবে—এই জানালার বাইরে যা দেখছি, তা বোঝানোর মতো কোনো শব্দই নেই," বলেণ তিনি।

গ্লোভার যখন একটি বস্তুকে কমলা রঙের বলে বর্ণনা করছিলেন, তখন মাটিতে থাকা দল জানায়, লালচে রঙের সেই বস্তুটি সম্ভবত মঙ্গল গ্রহ।

ওরিয়ন মহাকাশযানে থাকা চারজনকে উদ্দেশ করে মিশন কন্ট্রোল জানায়, "আমরা কোথায় যাচ্ছি, ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর এটি একটি ভালো সুযোগ।"

পরে অভিযানের সারসংক্ষেপে বর্ণনা সহায়তার জন্য আগামীকাল ২০টি নতুন বিশেষণ যোগ করার ইচ্ছার কথা মজা করে বলেন ক্রুরা।

'ওখানে পৃথিবী অসাধারণ উজ্জ্বল'

নাসার মহাকাশচারী ভিক্টর গ্লোভার সূর্যগ্রহনের সময়ে যা দেখছিলেন, তা "সাই–ফাই" এবং "অবাস্তব" বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সূর্যের করোনা বা বায়ুমণ্ডলের বাইরের দৃশ্যও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, "এটি এখনো অবাস্তবই মনে হচ্ছে। সূর্যটি চাঁদের আড়ালে চলে গেছে, কিন্তু করোনাটি এখনো দৃশ্যমান—এটি উজ্জ্বল এবং প্রায় পুরো চাঁদের চারপাশে একটি বলয়ের মতো তৈরি করেছে।"

"কিন্তু যখন পৃথিবীর দিকটি সামনে আসে, তখন আগেই পৃথিবীর আলো দেখা যায়। মানে, সূর্য চাঁদের আড়ালে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৃথিবীর আলো দেখা যায়। ওখানে পৃথিবীটি এত উজ্জ্বল, আর চাঁদটি যেন আমাদের সামনে ঝুলে আছে।"

"এখন আমাদের সামনে যে কালো গোলকটি রয়েছে—পুরো কালো নয়, বরং ধূসর রঙ ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। এর পেছনে আমরা তারা এবং গ্রহ দেখতে পাচ্ছি," বলেণ তিনি।

দৃশ্যটি "অত্যন্ত চমকপ্রদ" উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, "চাঁদের যে পাশে সূর্য অস্ত গেছে, সেই দিকের দিগন্ত এখনো কিছুটা উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর আলো খুবই স্পষ্ট, যা একটি অসাধারণ দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করছে। ওয়াও, এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য।"