বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না কেন

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, রাজনীতি, বাংলাদেশ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে বিরোধীদল বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দলটির তৃণমুলের নেতাদের অনেকে মনে করছেন।

তারা বলেছেন, সিদ্ধান্তহীনতার পেছনে নেতাদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এবং অগ্রাধিকার বা সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারা সহ বেশ কিছু বিষয় রযেছে।

দলটির তৃণমুলের নেতারা সংসদে যোগ দেয়া নিয়ে শেষ মুহুর্তে তাদের দলের সিদ্ধান্ত আকস্মিকভাবে বদলের বিষয়কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলেছেন, অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে এখন ছয় মাসের মধ্যে দল পুনর্গঠনের টার্গেট নেয়া হয়েছে।

সর্বশেষ, সংসদে যোগ না দেয়ার পুরোনো সিদ্ধান্ত থেকে বিএনপি যে হঠাৎ সরে এসেছে, এনিয়ে দলটির নেতৃত্ব দলের ভিতরে এবং বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এখন দলের সিনিয়র নেতারও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন।

বিএনপি, রাজনীতি, বাংলাদেশ।

ছবির উৎস, BNP FACEBOOK PAGE

ছবির ক্যাপশান, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির একটি বৈঠক। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে স্কাইপের মাধ্যমে যোগ দিয়েছিলেন।

গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করে বিএনপি এই সংসদে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত শেষ মুহুর্তে পাল্টিয়ে বিএনপি সংসদে গেছে।

এখন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনের পরেই তাৎক্ষণিকভাবে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়তো সঠিক ছিল না।

দলের আরেকজন সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।

তবে বিএনপির তৃণমুলের নেতাকর্মিদের অনেকে মনে করেন, সংসদে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্নেও নেতৃত্ব সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল বলে তাদের মনে হয়েছে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির একজন নেত্রী নার্গিস আলম চৌধুরী বলছিলেন, বিভিন্ন সময় সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।

"যারা আছেন আমাদের স্থায়ী কমিটিতে, উনাদের মধ্যে হয়তো মতবিরোধ আছে। সেকারণে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হচ্ছে। তারা কোনো ইস্যুতে সিদ্ধান্তে এক জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না।"

তারেক রহমান, বিএনপি, রাজনীতি, বাংলাদেশ।

ছবির উৎস, বিএনপি ওয়েবসাইট

ছবির ক্যাপশান, তারেক রহমান

৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়ার প্রশ্নে বিএনপিতে প্রথমে সিদ্ধান্তহীনতা ছিল। মাঠপর্যায়ের নেতা কর্মিরা এমন ধারণা পেয়েছিলেন।

শেষপর্যন্ত ড: কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যখন গঠন করা হয়, তখন বিএনপির নেতাকর্মিরা ঐ ফ্রন্টকে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটা প্লাটফরম হিসেবে দেখেছিলেন।

কিন্তু নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর সেই ফ্রন্ট নিয়েই বিএনপিতে বিতর্ক দেখা দেয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় জেলে রযেছেন।আর দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মামলার কারণে দেশে আসতে পারছেন না।

দলটির নেতারা বলছেন, তাদের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা লন্ডনে থাকা মি: রহমানের সাথে আলোচনা করে যৌথভাবে দল চালাচ্ছেন।

কিন্তু স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মাঝে বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল এবং নির্বাচনের পর দলের মহাসচিব ছাড়া আর কেউ জয়ী না হওয়ায় সেই ঘাটতি আরও বেড়েছে। সে কারণে দলটির নেতারা অগ্রাধিকার বা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারছেন না বলে দলের তৃণমুলের এবং মধ্যম সারির নেতাদের অনেকে মনে করছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি, রাজনীতি, বাংলাদেশ।
ছবির ক্যাপশান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী সাবেক এমপি নিলুফার চৌধুরী বলছিলেন, বিশ্বাসের ঘাটতির কারণেই দল ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বলে তিনি মনে করেন।

"আমি যদি বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলি, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে তাহলে আমি বলবো, বিশ্বাসের অভাবের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। আমার মনে হয়, এখানে বিশ্বাসের অবাব এবং নীতিহীনতার বিষয়ও আছে।"

বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবটা কোথায় বা কেন—এই প্রশ্নে বিএনপির এই নেত্রী নিলুফার চৌধুরী বলেছেন, "এখানে নেতৃত্বের কথাগুলোই বলবো।কারণ সারাদেশে আমাদের কর্মি যারা আছে, তারা কিন্তু নিবেদিত প্রাণ। নইলে ১২ বছর ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েও কিন্তু বিএনপির মাঠ পর্যায়ের জনপ্রিয়তা কমে নাই।"

"সেখানে আমাদের চালিকা শক্তির সমস্যাটাই আমার কাছে বড় মনে হয়। আর কি বলবো। এটা আমি আত্নসমালোচনা করে বলছি।"

তবে বিএনপির সিনিয়র নেতারা দাবি করছেন, তাদের দলে বিশ্বাসের কোনো ঘাটতি নেই।

ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়
ছবির ক্যাপশান, ঢাকার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারা সমস্যা এবং অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেই এগুচ্ছেন।

তিনি উল্লেখ করেছেন, তাদের দলের নেত্রীর মুক্তির জন্য তারা আইনগত লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। এরসাথে এখন তারা দল পুনর্গঠনের কাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে মি: আলমগীর জানিয়েছেন।

"ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা নিয়ে আমরা বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলছি। গণতান্ত্রিক যে রাজনীতি তার পরিসরতো খুব কমে গেছে। একেবারেই সংকুচিত হয়ে গেছে। যেটুকু আছে, সেটুকুর সদ্ব্যবহার করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। যেমন সংসদে আমাদের কয়েকজন সংসদ সদস্য গেছেন।"

"আমাদের দল পুনর্গঠনের কাজ আমরা করছি।অঙ্গসংগঠনগুলো এবং জেলা কমিটিগুলোকে আমরা নতুন করে তৈরি করছি। ছয় মাসের মধ্যে আমরা এটাকে গুছিয়ে আনতে পারবো। এমহুর্তে এই বিষয়গুলোকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।"

তিনি আশা করছেন, তাদের দল গুছিয়ে নেয়ার পর জনগণের সম্পৃক্ততা আছে, এমন বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তারা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন।