বিশ্লেষণ: ক্যাপিটল ভবনে তাণ্ডব এবং 'ব্র্যাণ্ড আমেরিকার' সর্বনাশ

    • Author, জনাথন মার্কাস
    • Role, বিবিসির সাবেক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংবাদদাতা

সারা বিশ্ব - বিশেষ করে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর অনেক নেতা - গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে নজিরবিহীন তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করেছেন বিস্ময় এবং একইসাথে আতঙ্ক নিয়ে।

প্রথম প্রতিক্রিয়া দেন নেটো জোটের সেক্রেটারি জেনারেল ইয়েন স্টলটেনবার্গ । তিনি টুইট করেন, “ওয়াশিংটনে ভয়ঙ্কর দৃশ্য। নির্বাচনী ফলাফলকে অবশ্যই মর্যাদা দিতে হবে।“

একটি জোটের শীর্ষ কর্মকর্তা সেই জোটেরই প্রধান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশকে নিয়ে এমন মন্তব্য করবেন - এ কথা কেউ কি কখনো কল্পনা করেছিল? বোধ হয় না।

আপনি হয়ত ধারণা করতে পারতেন যে বেলারুস বা ভেনেজুয়েলা নিয়ে মি. স্টলটেনবার্গ এ ধরনের কথা বলবেন। কিন্তু তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমেরিকার গণতন্ত্র এবং রাজনীতি নিয়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের চারটি বছরে আমেরিকার মর্যাদা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে - তা নেটো কর্মকর্তার একটি টুইট দেখেই অনেকটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এই সময়কালে বিশ্বে আমেরিকার প্রতিপত্তি এবং ‘সফট পাওয়ার‘ - অর্থাৎ মজবুত গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ভিত্তির জোরে প্রভাব তৈরির যে ক্ষমতা - তার রক্তক্ষরণ বহুগুণে বেড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসেছেন, ইরানের সাথে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে এনেছেন। তিনি বিদেশে সামরিক তৎপরতা কমিয়েছেন, কিন্তু বিকল্প হিসাবে কূটনীতির কোনো ব্যবস্থা করেননি।

ফলে, ইসরায়েল, সৌদি আরব, তুরস্কের মত অনুসারীরাও এখন নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে।

কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের গতিবিধির ওপর তারাও ভরসা করতে পারছে না।

সেই সাথে, মি. ট্রাম্প গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতাদের সাথে যতটা না উষ্ণতা দেখিয়েছেন - তার চেয়ে একনায়ক কর্তৃত্ববাদী নেতাদের বেশি কাছে টেনেছেন।

ফলে একসময় আমেরিকাকে দেখে সারা পৃথিবীর গণতন্ত্র-কামীরা যেভাবে উৎসাহিত হতো তা চরমভাবে গোঁত্তা খেয়েছে।

উল্টো আমেরিকার নিজের গণতন্ত্রের দুর্বলতা নগ্ন হয়ে পড়েছে।

‘অকার্যকর এবং বিভক্ত আমেরিকা‘

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ান ব্রেমার বলছেন, “শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা এখন রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে অকার্যকর এবং বিভক্ত একটি দেশে পরিণত হয়েছে।“

এই অবস্থার গুরুত্ব অনেক - কারণ মি. ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির কারণে বিশ্ব ব্যবস্থা গত চার বছরে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চীন এবং রাশিয়া দুটো দেশেই ভাবছে, ট্রাম্পের শাসনামলে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েছে।

সেইসাথে, উদার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন জাতিসংঘ এবং তার অনেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান, নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

সাইবার হামলা দিন দিন মহামারির মত বাড়ছে। প্যানডেমিক বা জলবায়ু পরিবর্তনের মত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে যে ধরণের শক্ত পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল, মি. ট্রাম্প তার ধারে-কাছেও ছিলেন না।

এটা সত্যি যে আমেরিকার নাক গলানোর কারণে অনেক সময় সমস্যা সমাধানের বদলে তা শতগুণে বেড়ে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা নীতি এখন অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের সময়কার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো ধসে পড়েছে। অথচ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মত নতুন নতুন বিপজ্জনক মারণাস্ত্র যেখানে তৈরি হচ্ছে, সেখানে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির গুরুত্ব বহুগুণে বেড়েছে।

সেইসাথে, চীন যেভাবে দিনে দিনে খবরদারি-সুলভ আচরণ করছে এবং রাশিয়া যেভাবে মারমুখী হয়ে উঠছে - তা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয়।

আমেরিকার নেতৃত্ব এখন তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।

কিন্তু সেই সময়েই গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প সমর্থকদের তাণ্ডব আমেরিকার প্রতিপক্ষরা যে রসিয়ে রসিয়ে উপভোগ করেছে - তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

নতুন একজন প্রেসিডেন্ট যখন ক্ষমতা নিচ্ছেন - তখন আমেরিকা কোভিড প্যানডেমিকের জেরে নাজেহাল।

অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ চীনের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ফলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হয়ত যথার্থই মনে করছেন যে তার রাষ্ট্রব্যবস্থাই আমেরিকানদের চেয়ে শ্রেয়।

রাশিয়া এখন আমেরিকার যতটা না কৌশলগত 'প্রতিদ্বন্দ্বী' - তার চেয়ে বেশি 'উৎপাত'। কিন্তু ট্রাম্পের সময়কালে রাশিয়ার পক্ষ থেকে হ্যাকিং এবং ভুয়া খবর ছড়ানোর প্রবণতা বহুগুণে বেড়ে গেছে।

যে প্রশাসনের দায়িত্ব জো বাইডেন নিতে চলেছেন, তার নানা অঙ্গের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে হয়ত রুশরা গোপনে ঢুকে বসে রয়েছে। এই পাইরেসির মাত্রা কত - তা হয়তো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না , কিন্তু গোপনীয়তা যে ভেঙেছে তা নিয়ে কারো মধ্যেই কোনো সন্দেহ নেই।

আমেরিকার মিত্ররাও বুঝতে পারছে যে নতুন প্রশাসনের জন্য কাজ করা সহজ হবেনা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা জি-সেভেন জোট জো বাইডেনকে সাদরে সম্ভাষণ জানাবে, কিন্তু সৌদি আরব, ইসরায়েল বা তুরস্কের মত দেশগুলো দ্রুত তাদের নীতি অদল-বদল করে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করবে বা ইতিমধ্যেই শুরু করেছে।

তারা নতুন মার্কিন প্রশাসনের সাথে নতুন করে দর কষাকষির পরিকল্পনা করছে।

নতুন মার্কিন প্রশাসনের প্রতি পশ্চিমা মিত্রদের হানিমুন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে সেই নিশ্চয়তা দেয়াও কঠিন।

মি. বাইডেন তার ইইরোপীয় মিত্রদের ওপর মি. ট্রাম্পের মতই শর্ত আরোপ করবেন হয়তো। তিনিও চাইবেন ইউরোপীয়রা যেন প্রতিরক্ষা বাজেটা বাড়ায়, নেটো জোটে বেশি পয়সা দেয়।।

ইরান, চীন এবং রাশিয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ কৌশলের জন্যও ইউরোপীয়দের প্রতিশ্রুতি চাইবেন তিনি।

কিন্তু নীতি বা কৌশলের ব্যাপারে এই কোয়ালিশন বা ঐক্য সহজ হবেনা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চীনের সাম্প্রতিক বিনিয়োগ চুক্তি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।

বাইডেন হয়তো এই চুক্তি বিলম্বিত করতে চাইতেন। আমেরিকানরা মনে করছে যে চীন যেভাবে উইগর মুসলিমদের সাথে আচরণ করছে, হংকংয়ে যে নীতি অনুসরণ করছে বা অস্ট্রেলিয়াকে যেভাবে চাপের মধ্যে রেখেছে, তাতে চীনের সাথে এমন চুক্তি করা সঙ্গত হয়নি।

ফলে, নীতি নিয়ে মতভেদ বা ইউরোপের নিজের নিরাপত্তা সার্বভৌমত্ব অর্জনের অভিলাষের কারণে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কে জটিলতা দেখা দেবে।

ট্রাম্প-বাদ নিয়ে মিত্রদের উদ্বেগ

সেই সাথে রয়েছে আরো একটি বড় সমস্যা, আর তা হলো অনেক দেশ এখন মনে করছে ট্রাম্প আপাতত সরে গেলেও ট্রাম্পিজম বা ট্রাম্প মতবাদ হয়তো পাকাপাকিভাবে চলে যাচ্ছেনা।

তাদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে মি. বাইডেন হয়ত চার বছরের জন্য একটি বিরতি নিশ্চিত করছেন, কিন্তু তার পর ট্রাম্প-বাদ নতুন শক্তিতে ফিরে আসবে।

ফলে, মি. বাইডেনের ব্যাপারে খুব ভরসা কি তারা করবেন? অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন আমেরিকার বৈদেশিক সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমেরিকার গণতন্ত্র পুন:নির্মাণ করে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে ‘ব্রান্ড আমেরিকা‘ নিশ্চিত করতে পারলেই শুধু আমেরিকার শত্রু এবং মিত্ররা আমেরিকাকে আগের মত গুরুত্ব দেবে, তার নেতৃত্বকে সমীহ করতে শুরু করবে।

তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেকটা শাঁখের করাতের মতো। যদি মি. বাইডেন বৈদেশিক সম্পর্কে সাফল্য চান, মর্যাদা চান - তাহলে তাকে তার বিদেশ নীতির প্রতি দেশের জনগণের সমর্থন আদায় করতে হবে।

কিন্তু সেই ভারসাম্য রক্ষা কঠিন। উদাহরণ হিসাবে চীনের কথা বলা যেতে পারে। সাধারণ আমেরিকানরা চাইবে, চীনা নীতি যেন এমন হয় - যাতে তাদের চাকরি ফিরে আসে বা নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

সেখানেই মি. বাইডেন সমস্যায় পড়তে পারেন, কারণ তিনি চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করতেও চান, আবার সহযোগিতাও চান।