অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর হত্যা রহস্য উদঘাটন প্লাস্টিকের সুতোর সূত্র ধরে, বলছে পুলিশ

***সতর্কতা: এই প্রতিবেদনের কোন কোন অংশ আপনার কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।

চলচ্চিত্র অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু হত্যাকাণ্ডের রহস্য প্লাস্টিকের একটি সুতোর সূত্র ধরে উদঘাটন করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরেই একটি সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার পুলিশ জানিয়েছিল, অভিনেত্রীকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্বামী এবং গুম করতে সহায়তার অভিযোগে স্বামীর একজন বন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পারিবারিক কলহের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার।

মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ''মরদেহ শনাক্তের পর সোমবার রাতেই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তার স্বামী এবং স্বামীর একজন বন্ধুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করি। সেখানে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রাথমিকভাবে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় এই ঘটনায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।''

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিস্তারিত তথ্য জানাতে রাজি হননি। তবে রাতে বাংলাদেশ পুলিশের নিউজ ওয়েবসাইটে হত্যাকাণ্ড, মৃতদেহ গুমের চেষ্টা ও হত্যা রহস্য উদঘাটনের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে।

যেভাবে পুলিশ হত্যাকারীকে শনাক্ত করলো

পুলিশ নিউজ নামের ওই ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই হত্যা-রহস্য উদঘাটন করেছে প্লাস্টিকের একটি সুতোর সূত্র ধরে।

সেখানে বলা হয়েছে, মৃতদেহ শনাক্তের পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করার পাশাপাশি অভিনেত্রী শিমুর বাসায় গিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে।

মৃতদেহ গুম করতে দুটো বস্তা যে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছিল, সেই সুতারই একটি বান্ডিল শিমুর স্বামীর গাড়িতে পাওয়া যায়। গাড়িটি ধোয়া ছিল এবং দুর্গন্ধ দূর করতে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়েছিল বলেও তারা দেখতে পায়।

তখন অভিনেত্রী শিমুর স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। সেই জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তখন গুমের চেষ্টায় সহযোগিতার অভিযোগে তার বন্ধুকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

হত্যা ও গুমের চেষ্টা

সেই জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ নিউজের খবরে বলা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী শিমুকে হত্যা করেছে। রবিবার (১৬ই জানুয়ারি) সকাল ৭টা-৮টার দিকে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। এরপর তার বন্ধুকে মুঠোফোনে কল করে ডেকে আনেন তিনি।

মৃতদেহ গুমের বিষয়ে পুলিশের ওয়েবসাইটে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, ''তারা দু'জন পরিকল্পনা করে বাইরে থেকে বস্তা এনে শিমুর লাশ লম্বালম্বিভাবে দুটি পাটের বস্তায় ভরে প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে সেলাই করেন। এরপর বাড়ির দারোয়ানকে নাশতা আনতে বাইরে পাঠিয়ে নিজের ব্যক্তিগত গাড়ির পেছনের আসনে শিমুর লাশ নিয়ে বেরিয়ে যান। প্রথমে তারা মিরপুরের দিকে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে লাশ গুমের উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে তাঁরা আবার বাসায় ফেরেন।''

'' ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আবার তাঁরা লাশ গুম করতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা ব্রিজ হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর ইউনিয়নের কদমতলী এলাকার আলীপুর ব্রিজের ৩০০ গজ দূরে সড়কের পাশে ঝোপের ভেতর লাশটি ফেলে চলে যান। তখন রাত সাড়ে নয়টা।''

তারা দুজনেই মাদকাসক্ত ও বেকার বলে পুলিশ উল্লেখ করেছে।

তবে বিবিসি বাংলা অভিযুক্ত বা তাদের পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

দুই সন্তানের মা শিমুর ছিল 'লাভ ম্যারেজ'

নিহত মিজ ইসলামের বোন ফাতিমা নিশা মঙ্গলবার সকালে কেরানীগঞ্জ থানা প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, ''কেন কে আমার বোনকে হত্যা করেছে, আমরা এখনো বুঝতেই পারছি না। আমার বোন জামাইয়ের সঙ্গে বোনের তেমন কোন কলহ ছিল না। তাদের ১৮ বছরের সংসার, তারা লাভ ম্যারেজ করেছিল"।

"তবে যেই হত্যা করুক, আমরা চাই, সঠিক বিচার হোক, আমরা মামলা করবো,'' বলেন ফাতিমা নিশা।

রাইমা ইসলাম শিমু দুই সন্তান ও স্বামীর সঙ্গে ঢাকার কলাবাগানের গ্রিন রোডে থাকতেন।

ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে মিজ ইসলামের মৃতদেহ শনাক্তের পর তার সাংবাদিকদের বলেছেন, বোনের ফোন বন্ধ পেয়ে এবং তিনি বাসায় না ফেরায় তাদের সন্দেহ হয়।

এরপর তারা হাসপাতাল, থানা ও এফডিসিতে খোঁজ নিতে শুরু করেন। কেরানীগঞ্জে অজ্ঞাত পরিচয় নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পেরে তারা মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে এসে বোনের খণ্ডিত মৃতদেহ দেখতে পান।

এর আগে সোমবার সকালে রাইমা ইসলাম শিমু নিখোঁজ জানিয়ে কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছিলেন তার স্বামী।

সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, রবিবার সকালে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান মিজ ইসলাম। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।

তবে পরবর্তীতে রাইমা ইসলাম শিমুকে হত্যার অভিযোগে সেই স্বামীকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: