আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
লিটন কুমার দাস: একসময় তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা ব্যাটসম্যান রানের হিসেবে এখন বিশ্বের সেরাদের একজন
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
লিটন কুমার দাস পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা তিন দলের বিপক্ষে এমন সময়ে সেঞ্চুরি তুলেছেন যখন দল বিপর্যস্ত।
নিয়মিতই ৫০ বা তারও কম রানে ৪-৫ উইকেট পড়ে গেলে লিটন দাসই ভরসা হয়ে উঠছেন বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাটিং লাইন আপে।
নিয়মিত সাত নম্বরে নামছেন তিনি কিন্তু তা নিয়ে লিটনের মধ্যে কোনও আপত্তি নেই।
তিনি বলছেন, "যেখানেই নামি, দল আমার কাছে রান চায়।"
বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থক ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের নানা লেখায় লিটন দাসের ব্যাটিং নিয়ে চলছে প্রশংসা।
ক্রিকেট মেন্টর ও বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্টের সাবেক ন্যাশনাল ম্যানেজার নাজমুল আবেদীন ফাহিম ২০২১ সালে বাংলাদেশের শীর্ষ ৫ জন ক্রিকেটারের এক তালিকা তৈরি করেছিলেন যেখানে লিটন কুমার দাসের নাম দেখে অনেকেই খুব একটা পছন্দ করেননি।
অনেকে বিরূপ মন্তব্য করেন সেখানে।
মি. আবেদীন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের খুব কাছে থেকে দেখেন এবং একইসাথে তিনি খারাপ ফর্মে থাকা ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করেন।
সম্প্রতি মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে কাজ করেন তিনি।
আলাদাভাবে কাজ করেছেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের মাঝে।
মুশফিক ইতোমধ্যে দুটো সেঞ্চুরি করেছেন।
লিটন দাসও নাজমুল আবেদীন ফাহিমের সরাসরি শিষ্যদের একজন, যে কোনও সমস্যায় তার কাছেই যান।
মি. আবেদীন নিজের ছাত্রের ওপর ভরসা রেখেছিলেন।
বলেছিলেন, লিটন ফিরবেই।
তখনকার বিশ্লেষণে মানসিক বাধার কথা উঠে এসেছিল।
এখন সেই মানসিক বাধা অনেকটাই লিটন পার করে এসেছেন বলেই মনে হচ্ছে।
অন্তত রানের খাতা তাই বলছে।
তবে লিটন দাস যখন খারাপ সময় পার করেছেন সেই সময়টাও খুব আগের নয়।
গত বছরের টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন কোম্পানি তাদের ফেসবুক বিজ্ঞাপনে লিটনের রানপ্রতি ডিসকাউন্ট ঘোষণা করেছিল।
তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব ছিল লিটনের ব্যাটে রান কম আসা নিয়ে নানা উপহাসে।
এমনকি সে সময় লিটন দাসের সহধর্মীনী এলডি সঞ্চিতা নিজের ফেসবুক একাউন্টে লিখেছিলেন, "অনেক সময় নির্দিষ্ট একজন কম রান করলে বা ক্যাচ ছাড়লেই এসব দেখতে হয়। হয়তো তার নামের কারণে। এসব উপহাস বা মিম বানানোর সাথেও আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু এখন দেখছি কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পাতা তার নাম ব্যবহার করছে, এবং পরোক্ষভাবে দোয়া করছে যাতে রান না পায়। মানুষের মন এত পঁচে গেছে যে আপনি একজন ক্রিকেটারের খারাপ পারফরমেন্সের জন্য দোয়া করছেন। লজ্জা!"
দুই হাজার একুশ সালের নভেম্বর মাস, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভরাডুবির পর বেশ কয়েকটি টেলিভিশন টানা স্ক্রল চালিয়েছে, 'বাজে পারফরম্যান্সের কারণে লিটন দাস দল থেকে বাদ।'
সাধারণত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোনও ক্রিকেটারকে যখন দল থেকে সরিয়ে উন্নতির সময় দিতে চায় তখন 'বাদ' শব্দটা ব্যবহার না করে 'বিশ্রাম'-ই বেশি ব্যবহার করে।
এবং লিটন দাস তখন ক্যারিয়ারে যে সময় কাটাচ্ছিলেন তার বিশ্রাম নেয়ার কোনও কারণ ছিল না।
তাই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের আগে এক সিরিজে বাদ পড়ার পর ক্রিকেট পাড়ায় এমন গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল - লিটন দাস আর জাতীয় দলের জন্য বিবেচিতই হবেন না।
মাঠে ভালো না খেলা, ক্রিকেট অনুসারীদের অনেকের উপহাস এবং শেষমেশ দল থেকে বাদ পড়া- লিটন দাসের জন্য প্রতিকূল এক পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
এরকম একটা সময়ে লিটন দাস ছিলেন নাজমুল আবেদীন ফাহিমের তত্ত্বাবধায়নে।
"লিটন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারতো না এক সময়। ও যেভাবে বেড়ে উঠেছে, সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ও কতটুকু স্বাধীনতা পেয়েছে সেটা একটা প্রশ্ন। কোচ থাকবে, শুভাকাঙ্ক্ষী থাকবে, সিনিয়র ক্রিকেটাররা থাকবে কিন্তু নিজের খেলাটা নিজের মতো করে বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ," বলেছেন মি. আবেদীন।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৪১ রানের ইনিংসের পর দ্বিতীয় দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে লিটন দাসের কথায় নিজের খেলাটা সম্পর্কে স্বচ্ছ একটা ধারণা পাওয়া গেছে।
লেগ সাইডে শ্রীলঙ্কার কড়া ফিল্ডিং সাজানোর পরেও টানা পুলশট খেলে গেছেন লিটন দাস।
এটা নিয়ে তিনি বলেছেন, "প্রতিটি খেলোয়াড়ের একেকরকম শট থাকে। আমার কাছে মনে হয়, গত এক দেড় বছর ধরে ভালোই পুল শট খেলছি। নিয়ন্ত্রণ আছে আমার। তাই বিশ্বাস ছিল যে, সে শর্ট বল করলেও এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারব, স্কোর করতে পারব।"
লিটন দাসের এই সংবাদ সম্মেলন নিয়ে মি. আবেদীনও সন্তুষ্ট।
"যেভাবে ও কথা বলছে এটা দারুণ। আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে তাকে।"
লিটন দাস নিজের একটা পদ্ধতি বের করেছেন। কী সেটা তা অবশ্য খোলাসা করতে চাননি তিনি।
লিটন দাস বলেছেন, "প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন এসেছে কিন্তু সেটা আমার ভেতরেই থাকুক"।
তবে দেশের সবচেয়ে ফর্মে থাকা ব্যাটসম্যান কেন সাত নম্বরে খেলছেন এই প্রশ্নটাও করেছেন অনেকে।
লিটন নিজে বলেছেন, তার কোনও সমস্যা নেই সাত নম্বরে খেলা নিয়ে।
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, "এতোদিন যে রান করলাম কোথায় নেমেছি আমি?"
নাজমুল আবেদীন ফাহিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "লিটন দীর্ঘ সময় উইকেটের পেছনে কাটান এটার একটা ক্লান্তি আছে। টানা বলের দিকে মনোনিবেশ করতে হয়। সেক্ষেত্রে সাত নম্বরে খেলাটা তাকে সময় দেয়"।
এখন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান খেলছেন ওপরের দিকে।
লিটন দাস বলেছেন, "বড় ভাইরা যখন বিদায় নেবেন তখন ওপরের দিকে এমনিই উঠবো, এখানে চিন্তার কিছু নেই"।
ফেসবুকে কেউ কেউ লিখছেন, বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়কের পদটায় বদল দরকার।
মমিনুল হককে নিয়ে অনেকেই সন্তুষ্ট নন।
কেউ কেউ আবার চাইছেন লিটন দাস অধিনায়ক হোক।
যদিও এমন অনেক উদাহরণও আছে - ভালো ব্যাটসম্যানরা অধিনায়ক হিসেবে তেমন সফল হন না।
আবার একইসাথে ব্যাটিংয়ে বিপরীত প্রভাবও পড়ে। এতে দলের ক্ষতিই হয়ে যায়।
তবে লিটনের যে চরিত্র তাতে মি. আবেদীনের মতে, "লিটন খেলাটা ভালো বোঝে। উইকেটের পেছন থেকে পর্যবেক্ষণ করে। এটা একটা ভালো দিক। লিটন ভালো অধিনায়ক হতে পারবে। উইকেটের পিছনে এমনিই বসে থাকে না"।
আবার লিটন দাসের ক্যারিয়ারের যে উত্থান-পতন এবং অভিজ্ঞতা এটাও খুব কাজে দেবে বলেই মনে করেন নাজমুল আবেদীন ফাহিম।
"ও যদি একটু সাহসী হয়ে উঠতে পারে খুব সম্ভাবনা আছে।"
লিটনকে খুব কাছে থেকে দেখে মি. ফাহিম বলেছেন, "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার লিটন খুব ভালো একজন মানুষ। যার আশেপাশে থাকলে অনেকে উপকার পাবে। সতীর্থরা ভরসা পাবে, সবার খেয়াল রাখে ও।"
টেস্ট র্যাংকিংয়ে লিটন দাস এখন বিশ্বের টেস্ট ব্যাটসম্যানদের তালিকায় সতের নম্বরে আছেন।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ শেষে লিটনের সেরা দশে ঢোকার একটা সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে ৮৮ ও ১৪১ রানের ইনিংস আছে তার।
এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনও ব্যাটসম্যান টেস্ট ক্রিকেটে সেরা দশজনের তালিকায় জায়গা পাননি।
দুই হাজার একুশ সালের শুরু থেকে হিসেব করলে লিটন দাসের চেয়ে বেশি রান করেছেন কেবল ইংল্যান্ডের জো রুট।
দুই হাজার কুড়ি সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে হিসেব করলে টেস্ট ক্রিকেটে লিটন দাস ১৫ ম্যাচ খেলে মার্নাস ল্যাবুশেইন, বাবর আজম, আজহার আলি, রোহিত শর্মা, চেতেশ্বর পুজারার চেয়ে বেশি রান তুলেছেন।
এই সময়ে লিটনের গড় ৫০.৬২।
তিনটি শতক ও আটটি অর্ধশতক ২৪ ইনিংস ব্যাটিং করে।
বাংলাদেশের অনলাইন ক্রিকেট পোর্টাল ক্রিকেট৯৭ এর একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে - গত ১২ মাসে কোনও উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান লিটনের চেয়ে বেশি রান তুলতে পারেননি।
- লিটন- ৭১৫
- রিশভ পন্ত (ভারত)- ৫৬২
- অ্যালেক্স ক্যারি (অস্ট্রেলিয়া)- ৩৬২
- জশুয়া ডি সিলভা (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)- ৩৩৯
- কাইল ভেরেনে (দক্ষিণ আফ্রিকা)- ৩০৪