আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ঢাকাসহ তিন বিভাগে ঝড়বৃষ্টি, কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির আভাস
কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে। এর মধ্যেই আবহাওয়া অফিস ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলেছে; কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে হতে পারে শিলাবৃষ্টি।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ওই তিন বিভাগ ছাড়াও দেশের অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
তবে সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি এবং খুলনার কুমারখালীতে, ৩৬ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ডিমলায়, ২০ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে যশোরে, ১৬ মিলিমিটার এবং গোপালগঞ্জেও ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর বাইরে রংপুরের বাজারহাট ও ভোলাতেও ১১ মিলিমিটার করে বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্য কোথাও বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে।
আবহাওয়াবিদরা বলে থাকেন, যখনই কোনো স্থানের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তখন সেই তাপমাত্রা প্রশমিত হওয়ার জন্য শিলাবৃষ্টি হয়ে থাকে।
আহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সাধারণত এপ্রিল ও মে মাসে সিলেটসহ দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে মেঘের উচ্চতা ১২ কিলোমিটারের উপরে চলে যায়। তখন সেটি শিলা আকারে পড়ে। আর শিলাবৃষ্টি হওয়া মানে সেখানে বজ্রপাত থাকবে।"
চলুন, এই প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনে নিই শিলাবৃষ্টি নিয়ে খুব সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
শিলাবৃষ্টি কী, কেন হয়?
সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, আকাশে যখন মেঘের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে বা মেঘ অনেক বেশি ভারি হয়ে ওঠে, তখন বৃষ্টির সময় আকাশ থেকে বরফের টুকরা বা মেঘের কণা পড়ে এবং একেই শিলাবৃষ্টি বলা হয়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিভিয়ার স্টর্মস ল্যাবরেটরির ওয়েবসাইটে শিলাবৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়েছে, শিলাবৃষ্টি হল কঠিন বরফের সমন্বয়ে এক প্রকার বৃষ্টিপাত, যা বজ্রঝড়ের উর্ধ্বমুখী স্রোতের ভেতরে তৈরি হয়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের শুরুতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বায়ুর প্রভাবে কালবৈশাখী হয়। তখন বাতাসে এক ধরনের উর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হয়।
সে কারণেই কালবৈশাখী ঝড় হয়। আর এর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দমকা হাওয়া, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত রয়েছে। এই কালবৈশাখী ঝড়ের বৈশিষ্ট্যের জন্যই শিলা বৃষ্টি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই ওয়েবসাইটে আরো বলা হয়েছে, বাড়িঘর, গাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হওয়া, এমনকি মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে শিলাবৃষ্টি।
মেঘের উচ্চতা কম থাকলেও বজ্রপাত হতে পারে। বজ্রপাতের সাথে মেঘের সম্পর্ক আছে, শিলাবৃষ্টির সাথে মেঘের উচ্চতার সম্পর্ক রয়েছে।
শিলাবৃষ্টি হলে সেখানে বজ্রপাত, বজ্রঝড় থাকবেই। বাংলাদেশের ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহে এখন মেঘের উচ্চতা বেশি রয়েছে বলেই ওই অঞ্চলে আগামী চারদিনের জন্য শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
কিভাবে শিলা গঠিত হয়?
যখন বৃষ্টির ফোঁটা বজ্রঝড়ের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত ঠাণ্ডা জায়গায় ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং জমাট বাঁধে, তখন শিলাবৃষ্টি তৈরি হয়।
শিলা কিভাবে তৈরি হয় – এ সম্পর্কে এভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্টর্মস ল্যাবরেটরির ওয়েবসাইটে বর্ণনা করা হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিলাবৃষ্টির প্রধান শর্ত প্রচণ্ড গরম।
বাংলাদেশে চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ রকম গরম পড়ে। ফলে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে যে কালবৈশাখী ঝড় হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই শিলাবৃষ্টি হয়।
এ সময় ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলের কোথাও কোথাও ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। ওই সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দখিনা বাতাস আসতে পারে।
তার সঙ্গে যোগ হয় বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের তাপীয় লঘুচাপ। একইসাথে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পে পূর্ণ আর্দ্র বাতাস যুক্ত হয়।
এই দু'টির সাথে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শীতল বাতাসের সংমিশ্রণে মেঘমালা তৈরি হয়।
এগুলো ভূ-পৃষ্ঠের তিন কিলোমিটার উপর থেকে আরো ১৮ থেকে ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে উঠে যায়।
জলীয় বাষ্প উপরে উঠে আরও ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং ছোট ছোট বরফ কণায় পরিণত হয়।
এই ছোট ছোট বরফ কণা আশে পাশের আরও বরফ খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং শিলা খণ্ডে পরিণত হয়।
শিলা খণ্ড যখন বেশি ভারি হয়ে যায়, তখন এর ওজনকে আর বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে না। তখন এগুলো শিলাবৃষ্টি আকারে ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে।
আহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, "এপ্রিল-মে মাসের মেঘ থেকে বজ্রপাতের মতো ঘটনা ঘটে। মেঘ যেখানে থাকে, সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরেও বজ্রপাত হতে পারে। আর এই সময়ে প্রচণ্ড ঝড় হয় এবং ঝড় ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মাঝে থেমে যায়। কিন্তু শিলাবৃষ্টি হয় সর্বোচ্চ এক থেকে পাঁচ মিনিট। কারণ এর ওজন বেশি। এটি নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।"
শিলাবৃষ্টির আকার কীভাবে নির্ধারণ হয়?
এর আগে, গতবছর আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, "হিমাঙ্ক থেকে মাইনাস ৮০ ডিগ্রী পর্যন্ত যেসব শিলাকণা তৈরি হয়, তার সাইজ যদি ক্লাউড টপ থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয় হিমাঙ্ক রেখা বরাবর তখন ওই শিলার সাইজ বড় হয়। কারণ তাপমাত্রা নেগেটিভ।"
"আবার হিমাঙ্ক রেখা পার হওয়ার পর শিলাবৃষ্টির সাইজ ছোট হতে থাকে। কোনো কোনো সময় ছোট ছোট হতে হতে বায়ুমণ্ডলেই বিলীন হয়ে যায়। অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠে পড়ে না" বলেন মি. মল্লিক।
হিমাঙ্ক রেখা হলো, যেখান থেকে বাতাসের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে নেমে যায়।
আর ক্লাউড টপ হলো, মেঘের দৃশ্যমান অংশের সর্বোচ্চ উচ্চতা।
শিলাবৃষ্টি আকার কত হয় সাধারণত?
গতবছর সিলেট ও সুনামগঞ্জে যখন ব্যাপক শিলাবৃষ্টি হয়, তখন 'বাংলাদেশের সিলেটের শিলাবৃষ্টির আকার কি অস্বাভাবিক?' শীর্ষক প্রতিবেদন করেছিলো বিবিসি বাংলা।
সেখানে তখন "হাফ ইঞ্চি ব্যাসার্ধে এক ইঞ্চি বৃত্ত আকারের শিলা" রেকর্ড করা হয়েছিলো।
তখন আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, "সাধারণত হাফ ইঞ্চি পর্যন্ত হয় শিলাবৃষ্টির সাইজ। সাধারণত এক থেকে একশ গ্রাম পর্যন্ত হয় এর আকার।"
তখন তিনি জানান, বাংলাদেশে বিশেষ করে নওগাঁ, সাতক্ষীরা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট,মাদারীপুর, ফরিদপুর, ঢাকা এসব এলাকায় মার্চ, এপ্রিল, মে মাসে এমনকি জুন-জুলাই মাসেও বজ্রমেঘ তৈরি হয়ে শিলাবৃষ্টি হয়।
তবে সিলেট অঞ্চলে শিলাবৃষ্টি বরাবর-ই বেশি হয়। কারণ এটি পাহাড় অধ্যুষিত এলাকা।
"এ ধরনের এলাকায় উত্তর পশ্চিম থেকে যখন মেঘগুলো আসে, তখন পাহাড়ি বাতাস ও অঞ্চলের সাথে সমন্বয় ঘটে শিলাবৃষ্টি বা বজ্রপাতের প্রবণতা বেড়ে যায়," ওইসময় বলেছিলেন সিলেট বিভাগের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন।
এই আরও আবহাওয়াবিদ জানান, মার্চ মাস থেকে মে এই তিন মাসকে প্রাক-মৌসুম বলা হয়। এই তিন মাস একই রকমের আবহাওয়ার পূর্বাভাস করা হয়।