বিভিন্ন ধর্মে কারুনের সম্পদ ও শাস্তির গল্প, যার সিন্দুকের চাবি বহন করত ৩০০ খচ্চর

কারুনের মাটির নিচে তলিয়ে যাওয়া নিয়ে আঁকা চিত্রকর্ম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কারুনের মাটির নিচে তলিয়ে যাওয়া নিয়ে আঁকা চিত্রকর্ম
    • Author, ওয়াকার মুস্তাফা
    • Role, সাংবাদিক, গবেষক
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ধরণী সেদিন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গিয়েছিল,আর সেই ব্যক্তি, যার ধনভাণ্ডারের চাবি বহন করা বহু শক্তিশালী মানুষের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল, তিনি মাটির নিচে তলিয়ে গিয়েছিলেন...

ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহে কারুনের সম্পদ এবং শাস্তির কাহিনী বর্ণিত আছে। খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি- উভয়েরই প্রধান ধর্মগ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ আছে।

বাইবেলে তাকে 'কোরাহ' নামে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরানে তাকে 'কারুন' নামে অভিহিত করা হয়েছে।

ধর্মের ব্যাখ্যাকারী আলেমদের মতে, পবিত্র কোরানে কারুনের ওই ঘটনার অর্থাৎ, একজন ব্যাপক বিত্তশালী ব্যক্তির ইসরায়েলিদের কাছে প্রেরিত নবী মুসার বিরোধিতার উল্লেখ করার কারণ ছিল মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশ নেতারা যখন ইসলাম ধর্মের নবীর প্রতি চরম শত্রুতা প্রদর্শন করেছিলেন, তার সাথে সাদৃশ্য দেখানাে।

কোরানের ২৮তম সূরা 'আল-কাসাসে' বলা হয়েছে, "তোমরা ধনসম্পদের মোহে অন্ধ হয়ে যেও না। তাদের বলে দাও যে, কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়েরই একজন, কিন্তু সে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।"

এই বিদ্রোহ বা অবাধ্যতার মূল কারণ ছিল মুসা, যাকে ইসরায়েলিরা তাদের নেতা হিসেবে গণ্য করত এবং যার সাথে তারা মিশর ত্যাগ করে হিজরত করতে প্রস্তুত ছিল, এ কারণে তার প্রতি কারুনের ঈর্ষা।

কারুন চিত্রকর্ম

ছবির উৎস, Universal History Archive/Universal Images Group via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিপুল সম্পদই ছিল কোরাহ বা কারুনের বিদ্রোহ এবং অহংকারের মূল কারণ

ওই ঘটনার বিবরণ কেবল ইসলাম ধর্মেই নয়, বরং খ্রিস্টধর্মেও পাওয়া যায়।

বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের গণনাপুস্তকে লেখা আছে যে, "লেভির পুত্র কহাত, কহাতের পুত্র ইজহার, আর ইজহারের পুত্র কোরাহ, এবং রুবেণের পুত্র ইলীয়াবের পুত্র দাথন ও অবিরাম এবং পেলতের পুত্র ওন - তারা একত্রে দলবদ্ধ হলেন।

তারা মুসার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন এবং তাদের সাথে ইসরায়েলের আরও ২৫০ জন পুরুষ যোগ দিলেন, যারা ছিলেন গোত্র প্রধান, মনোনীত এবং গ্রহণযোগ্য ও নামী ব্যক্তি।"

কারুনের ধনভাণ্ডার

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পবিত্র কোরানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'আমি তাকে (কোরাহ বা কারুনকে) এমন ধনভাণ্ডার দান করেছিলাম, একদল শক্তিশালী মানুষের পক্ষেও যার চাবিগুলো বহন করা কষ্টসাধ্য ছিল।'

প্রথম শতাব্দীর ইহুদি ইতিহাসবিদ ফিলিপ জোসেফাস তার 'অ্যান্টিকুইটিজ অফ দ্য জিউস' বইতে কারুনের সম্পদের বর্ণনা দিয়েছেন, যা আব্দুল মজিদ দরিয়াবাদি তার 'তাফসিরে মাজিদি' নামক বইয়ে উদ্ধৃত করেছেন, যা প্রথমে ইংরেজিতে এবং পরবর্তীতে উর্দুতে প্রকাশিত হয়েছিল।

"কারুন ছিলেন বংশমর্যাদা এবং সম্পদ, উভয় দিক থেকেই একজন উচ্চবংশীয় বিশিষ্ট ইহুদি। তিনি দেখেছিলেন যে নবী মুসা সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত। এতে তিনি রুষ্ট ছিলেন এবং মুসার প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে শুরু করেন, যদিও তিনি মুসার গোত্রেরই লোক এবং তার আত্মীয় ছিলেন।"

"কারুন বিশেষ করে এ অভিযোগ করতেন যে, তার অগাধ সম্পদ এবং পারিবারিক মর্যাদা মুসার চেয়ে কোনো অংশে কম না হওয়ার কারণে, মুসা যে সম্মানজনক অবস্থানে আছেন, তিনি নিজেই তার বেশি যোগ্য।"

'দ্য জিউইশ এনসাইক্লোপিডিয়া'য় উল্লেখ করা হয়েছে যে, "কারুনের ধনভাণ্ডারের চাবিগুলো বহন করার জন্য ৩০০টি খচ্চরের প্রয়োজন হতো।"

আর এই সম্পদই ছিল কোরাহ বা কারুনের বিদ্রোহ এবং অহংকারের মূল কারণ।

ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহে কারুনের সম্পদ এবং শাস্তির কাহিনী বর্ণিত আছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহে কারুনের সম্পদ এবং শাস্তির কাহিনী বর্ণিত আছে

কারুনকে হুশিয়ারি

কোরানে বর্ণিত হয়েছে, "যখন তার কওমের লোকেরা তাকে উপদেশ দিয়ে বলেছিল, 'অহঙ্কার করো না, কারণ আল্লাহ অহঙ্কারী ব্যক্তিদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের আবাস অনুসন্ধান করো।

তবে, দুনিয়া থেকে তোমার অংশটুকু গ্রহণ করতে ভুলে যেয়ো না। আল্লাহ তোমার প্রতি যেমন অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও তেমনি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।'"

ধর্ম ব্যাখ্যাকারী আলেম জাভেদ আহমদ গামিদী তার 'আল-বায়ান' তাফসীরে লিখেছেন যে, 'জাতির জ্ঞানী ব্যক্তিরা অত্যন্ত নম্র ভাষায় কারুনকে সতর্ক করেছিলেন যে, যারা সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ পাওয়ার পর অহঙ্কারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার দুঃসাহস দেখায়, শেষ পর্যন্ত তাদের সৃষ্টিকর্তার হাতেই ধরা পড়তে হয়।'

জাভেদ আহমদ গামিদী বলছেন, "বলা হয়ে থাকে, জগতের সবকিছুই আল্লাহর দান। একে নিজের উত্তরাধিকার কিংবা নিজের যোগ্যতা ও বিশেষ অধিকারের নিদর্শন মনে করো না। তোমার অনন্ত জীবনের জন্য এখান থেকে সেটুকুই কাজে আসবে, যা তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করবে এবং এখান থেকে সেখানে (পরকালে) নিয়ে যাবে।"

তিনি আরও লিখেছেন, "এটি সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ যে তিনি তোমাকে এত সম্পদ দিয়ে ধন্য করেছেন। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে নিজের গুণাবলির প্রতিফলন দেখতে চান এবং তিনি সেই সমস্ত মানুষকে পছন্দ করেন, যারা তার সৃষ্টির প্রতি সদয় ও উদার আচরণ করে।"

এই উপদেশের প্রেক্ষাপটে কারুনের জবাব কোরানে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আল-কাসাসে বলা হয়েছে, "সে জবাব দিলাে, আমি আমার নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে এসবের মালিক হয়েছি।"

কোরানে বলা হয়েছে, "সে কি জানত না যে, আল্লাহ তার পূর্বে এমন অনেক জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন, যারা শক্তিতে তার চেয়েও প্রবল এবং লোকসংখ্যায় তার চেয়েও বেশি ছিল? আর এই অপরাধীদের তাদের পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেসও করা হবে না (কারণ আল্লাহ তা আগে থেকেই জানেন)।"

কারুনের কাহিনী চিত্রকর্ম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কারুনের কাহিনী চিত্রকর্ম

কারুনের পরিণতি

কারুনের বিত্ত ও ঐশ্বর্য দেখে কেউ কেউ যেমন অভিভূত হয়েছিলেন, আবার কেউ কেউ তার পরিণতি দেখে আতঙ্কিত হয়েছিলেন।

কোরানে বলা হয়েছে যে, "(একদিন) সে তার সম্প্রদায়ের সামনে জাঁকজমক ও শান-শওকতের সাথে উপস্থিত হলো। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত তারা (তাকে দেখে) বলল, 'হায়! কারুনকে যা দেওয়া হয়েছে, আমাদেরও যদি তা থাকতাে! আসলেই সে খুবই ভাগ্যবান।"

"আর যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছিল, তারা বলল, 'ধিক তোমাদের! যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য আল্লাহর দেওয়া পুরস্কারই উত্তম, (এটি এমন এক প্রজ্ঞা যা প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা করা উচিত) এবং এটি কেবল ধৈর্যশীলরাই লাভ করে।"

কোরানে বলা হয়েছে, কারুনের পরিণতি ছিল এমন, "অতঃপর আমি কারুন ও তার প্রাসাদসহ তাকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম। তাকে সাহায্য করার মতো কোনো বাহিনী ছিল না এবং সে নিজেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি।"

"আর যারা গতকাল পর্যন্ত তার মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছিল, তারা (তার এই পরিণতি দেখে) আর্তনাদ করে বলতে লাগল, 'আফসোস! আমাদের তো এটাই বলা হতো যে, আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা সীমিত করে দেন।"

কারুন সম্পর্কে বাইবেলে কী বলা হয়েছে?

তালমুদীয় পণ্ডিত বা র‍্যাবাইরা 'কোরাহ' নামের অর্থ করেছেন 'টাক' বা 'শূন্যতা'। তার বিদ্রোহের ফলে ইসরায়েলিদের মধ্যে যে শূন্যতা বা অপূরণীয় ক্ষতি তিনি তৈরি করেছিলেন, সে কারণেই তাকে ওই নাম দেওয়া হয়েছিল।

বাইবেলে এটি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, "যখন কারুনের বা কোরাহর বিদ্রোহ একটি ফিতনায় পরিণত হলো, তখন মুসা তাকে এবং তার সঙ্গীদের মুবাহালার (দুই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সত্য প্রমাণের প্রতিযোগিতা) আহ্বান জানালেন, যাতে খোদার ফয়সালা মানুষের সামনে প্রকাশ পায়।"

বুক অব নাম্বারস বা গণনা পুস্তকে বলা হয়েছে, "আর দাথন ও অবিরাম বের হয়ে এসে তাদের স্ত্রী, পুত্র ও ছোট সন্তানদের নিয়ে তাঁবুর দরজায় দাঁড়াল। তখন মুসা বললেন, 'এর মাধ্যমেই তোমরা জানতে পারবে যে, সদাপ্রভু আমাকে এ সমস্ত কাজ করার জন্য পাঠিয়েছেন। কারণ, আমি নিজের ইচ্ছায় কিছু করিনি।

যদি এই ব্যক্তিরা (অ্যারন ও তার সঙ্গীদের নির্দেশ করে) সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে মারা যায় বা কোনো মহামারি তাদের ওপর আসে, তবে জানবে যে আমি খোদার প্রেরিত নই'।"

"কিন্তু খোদা যদি নতুন কিছু করেন এবং পৃথিবী তার মুখ খুলে তাদের এবং তাদের পরিবারকে গিলে ফেলে এবং তারা জীবন্ত অবস্থায় পাতালে চলে যায়, তবে তোমরা বুঝতে পারবে যে এই লোকগুলো খোদাকে তুচ্ছ করেছে।"

কারুনের ধ্বংসের কাহিনী চিত্রকর্ম

ছবির উৎস, Getty Images

তার কথা শেষ হতে না হতেই তাদের পায়ের নিচের মাটি ফেটে গেল এবং পৃথিবী তার মুখ খুলে তাদের, তাদের পরিবারকে, কোরাহর সাথে থাকা সব মানুষকে এবং তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ গিলে ফেলল।

তারা তাদের সমস্ত কিছু সহ জীবন্ত অবস্থায় মাটিতে তলিয়ে গেল এবং পৃথিবী তাদের ওপর বন্ধ হয়ে গেল। এভাবেই তারা সমাজের মধ্য থেকে বিলুপ্ত হলো। তাদের চিৎকার শুনে চারপাশের সমস্ত ইসরায়েলিরা এই বলে পালিয়ে গেল, 'পাছে পৃথিবী আমাদেরও গিলে ফেলে'।"

বুক অব নাম্বারস বা গণনা পুস্তকে আরও বলা হয়েছে যে, 'ইসরায়েলিদের মধ্যে যারা কোরাহ, দাথন এবং অবিরামের (এবং তাদের পরিবারের) এই পরিণতিতে অসন্তুষ্ট ছিল, তারা মুসার কাছে গিয়ে প্রতিবাদ করেছিল।

তখন ঈশ্বর মুসাকে সেসব মানুষের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করার নির্দেশ দেন। এরপর মহামারির মাধ্যমে ১৪,৭০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়, যা ছিল কোরাহর মৃত্যুতে প্রতিবাদ করার শাস্তি।'

কারুনের সন্তানদের অনুতাপ

নিউ টেস্টামেন্টেও কোরাহের উল্লেখ রয়েছে, বিশেষ করে জুড ১:১১ পদে, যেখানে বলা হয়েছে, "ধিক্‌ তাদের! তারা কয়িনের পথে চলেছে, লাভের আশায় বালামের ভ্রান্তিতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে এবং কোরাহর বিদ্রোহে ধ্বংস হয়েছে।"

ইহুদি ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ শাশ মিডরাশ অনুযায়ী, "যেহেতু কোরাহর বিদ্রোহের প্রধান অস্ত্র ছিল তার মুখ, তাই তার শাস্তি হিসেবে তাকে পৃথিবীর মুখ বা গহ্বর গ্রাস করেছিল।"

বুক অব নাম্বারসে বলা হয়েছে, "কিন্তু কোরাহর সন্তানরা মারা যায়নি।"

মিডরাশে উল্লেখ করা হয়েছে, "পৃথিবী কোরাহকে গ্রাস করার পূর্বেই তার সন্তানরা অনুতপ্ত হয়েছিল, যার ফলে তারা রক্ষা পায়। পরবর্তীতে তাদের বংশধরেরা মন্দিরের গায়কদলের সাথে যুক্ত হয়েছিল।"

এভাবে, কোরাহর সন্তানদের কাহিনী অনুতাপের মাধ্যমে পরিত্রাণের প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যেখানে কারুনের কাহিনী হয়ে উঠেছে অনন্ত ধ্বংস ও চিরস্থায়ী বিদ্রোহের প্রতীক।