যুদ্ধ নিয়ে ইরানের মানুষকে কী খবর জানানো হচ্ছে?

ছবির উৎস, IRTV
- Author, রেহা কানসারা
- Role, বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফর্মেশন ইউনিট
- Author, সোরুশ নেগাহদ্রি
- Role, বিবিসি মনিটরিং
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
প্রথম খবরটা ফুটে উঠেছিল বিদেশি টিভির পর্দায়, যে টিভির সিগন্যাল ইরানিদের কাছে পৌঁছায় না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২৮শে ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন যে "ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে অত্যাচারী আর নেই", অর্থাৎ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যৌথ হামলায় মেরে ফেলা হয়েছে।
ইরানের মানুষ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নজর রেখেছিলেন, সেখানে নিস্তব্ধতা।
সরকারি কর্মকর্তারা খামেনির মৃত্যুর কথা তখন স্বীকারও করছিলেন না, আবার খারিজ করেও দিচ্ছিলেন না।
একটি রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল, আইআরটিভি৩-র এক সংবাদ উপস্থাপক দর্শকদের অনুরোধ জানান যে তার ওপর 'ভরসা' রাখতে এবং সরকারের কাছে যে 'সর্বশেষ তথ্য আছে', তা বিশ্বাস করততে।
মি. খামেনির মৃত্যুর খবরকে তিনি 'ভিত্তিহীন গুজব' বলে বর্ণনা করেন, এবং জানান "শীঘ্রই তা প্রকাশিত হবে"।
পর দিন সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মি. খামেনির মৃত্যুর খবর দেয়, সেটাও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে সে খবর পোস্ট করার বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে।
যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানের ১২০০ রও বেশি মানুষ মারা গেছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। লেবানন আর উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব রাষ্ট্রগুলিতেও নিহত হয়েছেন বহু মানুষ।
তবে, ইরানের গণমাধ্যম কল্পকাহিনীর সঙ্গে সত্য খবর মিশিয়ে সরকারি ভাষ্যটা প্রচার করছে তাদের দর্শক আর পাঠকদের কাছে।
যদিও লক্ষ লক্ষ ইরানি বিদেশ-ভিত্তিক ফার্সি ভাষার স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল দেখেন, তবে স্বাধীন ভাবে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন।
ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া, সেন্সর ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রিত চ্যানেল – এসব মিলিয়ে অশান্ত পরিস্থিতি আর সংঘাতের সময়ে ইরান বাইরের পৃথিবী থেকে মোটামুটি বিচ্ছিন্নই থাকে।
বিবিসি দেখার চেষ্টা করেছিল যে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কীভাবে যুদ্ধের খবর দেখাচ্ছে।
দেখা গেছে, তাদের প্রতিবেদনগুলিতে জোর দেওয়া হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকদের দুঃখকষ্ট, 'শত্রুদের' বিরুদ্ধে প্রতিআক্রমনে যাওয়ার আহ্বান, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি মানুষের আনুগত্য – এসব বিষয়ের ওপরে।
দেশটির সামরিক বাহিনী আর সরকারি স্থাপনার ওপরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর তেমনভাবে প্রকাশ বা প্রচার করা হচ্ছে না।
সেই সাথে ভুয়া তথ্যের উদাহরণও বিবিসি পেয়েছে।

ছবির উৎস, Fatemeh Bahrami/Anadolu via Getty Images
ইরানের প্রচার যন্ত্র
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের ওপরে নজরদারির আন্তর্জাতিক সংগঠন, 'রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার্স' বলছে যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে ইরান বিশ্বের সব থেকে দমনমূলক দেশগুলির অন্যতম।
যখন ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র সৃষ্টি হল, তখন থেকেই সব গণমাধ্যমকে কড়া নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করতে হয়। বিবিসি ফার্সিসহ বেশিরভাগ ফার্সি গণমাধ্যম, যারা বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালিত হয়, তাদের ইরান থেকে রিপোর্টিং করা নিষিদ্ধ।
যদিও দেশটির বর্তমান প্রশাসনের মূল গণমাধ্যম হলো রেডিও এবং টিভি, তবে তারা বিভিন্ন খবরের ওয়েবসাইট ও ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম এবং এক্সের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইনেও সংবাদ দেয়।
ইরানের অভ্যন্তরে এইসব সামাজিক মাধ্যমগুলি ভিপিএন ব্যবহার করে চালাতে হয়।
সেদেশের মানুষের কাছে তথ্যের প্রধান সূত্র রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম, বিশেষত যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠন 'উইটনেস'-এর মাশা আলিমার্দানি বলছেন, "তাদের (সরকারের) একটা ভাষ্য আছে, যেটা তারা ছড়িয়ে দেয়। এ ভাষ্য অনুযায়ী, তারা মোটামুটি বিজয়ী দেশ এবং তাদের সামরিক বাহিনী খুবই শক্তিশালী।"
ইরানের একাধিক রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে ইরানের সামরিক বাহিনী শত শত মার্কিন সেনাকে হত্যা করেছে বা আহত করেছে। শত্রুপক্ষের মৃত্যু সংখ্যাকে তারা অনেকটা বাড়িয়ে দেখায়।
ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট 'তাসনিম নিউজ' নামে আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তেসরা মার্চ প্রতিবেদন করে যে যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫০ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছে।
আইআরজিসির একজন মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদন করা হয়েছিল।
ভারত, তুরস্ক আর নাইজেরিয়ার মতো দেশের সংবাদ মাধ্যম ওই খবরটি নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল।
সেসময়ে পেন্টাগন ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্ট-কম ১৩ই মার্চ আরও সাতজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে।

বাস্তবতার বিকৃতি
নতুন প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচারযন্ত্রকে সহায়তা করার জন্য।
এখন ডিলিট করে দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টে সরকারি ইংরেজি ভাষার খবরের চ্যানেল 'প্রেস টিভি' একটি ভিডিও শেয়ার করেছিল, যাতে দেখা গিয়েছিল যে একটি ভবন জ্বলছে, ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে আকাশে।
তাতে লেখা হয়েছিল "ইরানের হামলার পরে বাহরাইনের একটি বহুতল ভবন থেকে ধোঁয়া উঠছে"।
তবে, নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে ওই ভিডিওটিতে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা আছে, যেমন দুটি গাড়িকে একসঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায় যে সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো ভুয়া ভিডিও।
"যুদ্ধের প্রচারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে বানানো কন্টেন্ট একেবারেই নতুন নয়। যেটা বিস্ময়কর, তা হল, যে সব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সত্য খবর প্রকাশ করার সুনাম নেই, তারাও এআই দিয়ে ভুয়া খবর বানাচ্ছে," বলছিলেন যুক্তরাজ্য ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট অফ স্ট্র্যাটেজিক ডায়লগের সিনিয়র ডিরেক্টর ব্রেট শ্যাফার।
তার কথায়, "ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বারবার যেভাবে ডিপফেক ব্যবহার করছে, তা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে এটা তাদের যুদ্ধের খবরাখবর দেওয়ার একটা অঙ্গই হয়ে উঠেছে। এটা কোনও 'বাগ' নয়।"
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি বা ভিডিওর-র বেশিরভাগই যে কে বা কারা বানালো, অথবা কোথা থেকে এল, তা স্পষ্ট নয়।
তবে, বিবিসির নজরে এসেছে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিজেদের ভাষ্যটা প্রচার করার জন্য বিভিন্ন সরকারি গণমাধ্যমই এআই দিয়ে তৈরি করা অন্যান্য ছবিও শেয়ার করেছে।
এসব গণমাধ্যমের বেশিরভাগই অতিরিক্ত পর্যায়ের অবাস্তব এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার থেকেও তাদের বড় উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের গৌরবান্বিত করা।
হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মিতই এআই দিয়ে বানানো ছবি বা ভিডিও শেয়ার করেন, যেগুলির উদ্দেশ্য হলো গৌরবান্বিত করা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে একটি এআই দিয়ে বানানো ছবি পোস্ট করেছিলেন, যাতে তিনি নিজে, মি. ট্রাম্প এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে বিজয়ী পোজ দিতে দেখা গিয়েছিল।
ইনস্টাগ্রামের 'কোলাবরেশন' ফিচারটি ব্যবহার করে একটি সংবাদমাধ্যম ওই পোস্টটি ব্যবহার করেছিল।

ছবির উৎস, Iranian Press Center/AFP via Getty Images
সত্যের সঙ্গেই মিশিয়ে দেওয়া হয় ভুয়া তথ্য
সঠিক তথ্যের সঙ্গে ভুয়া তথ্য মিশিয়ে পরিবেশন করার ইতিহাস আছে ইরানের, তাই তাদের সংবাদ নিয়ে দেশের ভেতরে আর বাইরে প্রশাসনের অনেক সমালোচকেরই সন্দেহ হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তেসরা মার্চ রিপোর্ট করে যে একটি স্কুলে হামলা চালানোর ফলে ১৬০ জনেরও বেশি শিশু ও কর্মী নিহত হয়েছেন। ওই ঘটনাটিকে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে সম্ভবত ওই মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কাছাকাছি থাকা একটি সামরিক ঘাঁটি।
ওই প্রতিবেদনেই দেখানো হয় একটি গণ কবরের ছবি, সরকার বিরোধীরা দাবি করেন যে ওই ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।
তবে ওই ছবিটি ভুয়া নয়।
বিবিসি ওই ছবিটির জিওলোকেশন দিয়ে একটি কবরস্থান চিহ্নিত করেছে, যেটি ওই স্কুল থেকে প্রায় তিন দশমিক সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ওই ছবিতে থাকা গাছ, রাস্তা আর কাছের একটি ভবনও দেখা গেছে, যার সঙ্গে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি মিলে গেছে।
ওই গণকবরের পরের দিন পাওয়া স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন করে খোঁড়া কবরের ছবিও পাওয়া গেছে। তার আগের দিন ওই জমিটি খালি ছিল।
"আমাদের দুটি সত্যের দিকে একই সঙ্গে তাকাতে হবে," বলছিলেন 'উইটনেস'এর মাশা আলিমার্দানি।
ইরানের প্রশাসন যখন নির্যাতন চালায়, সে তথ্য তারা গোপন করে, তবে যুদ্ধের সময়ে তারা বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরতে প্রচুর পরিশ্রম করে।
তিনি বলছিলেন, ওই তথ্য সংগ্রহ করে তাদের প্রচার এবং যুদ্ধ নিয়ে রাষ্ট্রের ভাষ্য সমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তা সবসময়েই মিথ্যা হয়ে যায় না।
মাশা আলিমার্দানি বলছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে "কিছুটা নির্ভরযোগ্য আর কিছুটা সন্দেহের চোখে" দেখা যেতে পারে।








