'পাঁজর থেকে সৃষ্টি': ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মে হাওয়ার ভূমিকা কীভাবে বর্ণিত হয়েছে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, এডিসন ভেগা, ওয়াকার মুস্তাফা
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা
- পড়ার সময়: ১০ মিনিট
খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ 'বাইবেল (ইঞ্জিল)' ও 'তোরাহ'-তে 'ইডেনের উদ্যান' থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনায় ইভ বা হাওয়াকে মূল চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কারণ এই দুই পবিত্র গ্রন্থ অনুযায়ী, হাওয়াই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য নবী আদমকে বলেছিলেন।
কিন্তু ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের বর্ণনা ভিন্ন। কোরান অনুযায়ী, 'ইবলিস' অর্থাৎ শয়তান দুজনকেই ধীরে ধীরে প্রলুব্ধ করেছিল, এরপর তারা দুজনেই গাছের ফলের স্বাদ গ্রহণ করে।
এর ফলে 'তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় এবং তারা বাগানের পাতা দিয়ে নিজেদের দেহ ঢাকতে শুরু করে'।
আল্লাহর শিক্ষা অনুযায়ী দুজনই মাফ চেয়েছিলেন এবং দু'জনই ক্ষমা লাভ করেন, এবং দুজনকেই ভ্রমণের আদেশ দেওয়া হয়।
হযরত আদম ও হযরত হাওয়াকে পৃথিবীতে পাঠানোর আগে যেখানে রাখা হয়েছিল সেই স্থানটির কথা উল্লেখ করতে কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল তার বাল-ই-জিব্রাইল বইয়ের একটি কবিতায় 'বাগ-ই-বেহেশত' (বেহেশতের বাগান) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
একই কবিতায় তিনি সেই স্থান ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ বোঝাতে 'হাকাম-ই-সফর' (যাত্রার আদেশ) শব্দটি ব্যবহার করেছেন:
"আমাকে বাগ-ই-বেহেশত ছেড়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল,
যাত্রা এতো দীর্ঘ কেন? এখন আমার জন্য অপেক্ষা করো।"
কোরানের সূরা আল-আ'রাফে এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ধর্মীয় চিন্তাবিদ জাভেদ আহমদ গামিদি তার তাফসিরে লিখেছেন, এখানে যে গাছের কথা বলা হয়েছে, সেই গাছ বোঝাতে, 'আল-শাজারাহ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
সূরা ত্বা-হার একটি আয়াতে সেই গাছটিকে 'শাজারাতুল খুলদ' বলা হয়েছে।
'এ থেকে স্পষ্ট যে এখানে আল-শাজারাহ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'শাজারাতুল খুলদ' শব্দটির অর্থ এবং এই গাছের ফল খাওয়ার যে প্রভাবগুলো পরে বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে এখানে মূলত সেই উর্বর গাছের (শাজারা-ই-তানাসুল) কথাই বলা হয়েছে, যার ফল খাওয়ার কারণেই মানুষ এই দুনিয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
তবে আজও পৃথিবীতে মানুষের জন্য যদি সবচেয়ে বড় কোনো পরীক্ষা থেকে থাকে, সেটি এই গাছই। অর্থাৎ যৌন আকর্ষণ ও ভোগ, যার সঙ্গে আদম ও হাওয়া তখনো পরিচিত হননি।"

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তবে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক বহু নতুন গবেষণার উদ্দেশ্য হলো মানুষের সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত এই ঘটনাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা, যাতে হজরত হাওয়ার ভূমিকা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ও গভীর ধারণা পাওয়া যায়।
১৮শ শতকে ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোট ইভ অর্থাৎ হজরত হাওয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
মানবজাতির উৎপত্তির কাহিনি সম্পর্কে নিজের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, "ইভ মানবজাতির কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিয়েছিলেন, আর এই কারণেই তাকে ইডেন উদ্যান থেকে বের করে দেওয়া হয়, যাকে স্বর্গ হিসেবে ধরা হয়।"
জাভেদ আহমদ গামিদির তাফসির অনুযায়ী, এটি সম্ভবত এই পৃথিবীরই কোনো একটি বাগান ছিল, যাকে আদম ও হাওয়ার আবাসস্থল ঘোষণা করা হয়েছিল।
তিনি লিখেছেন, এখানে মূলত 'ইহবিতু' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ 'এতে নেমে যাও বা অবতরণ করো'। এই অর্থ সূরা আল-বাকারা'র ৬১ নম্বর আয়াতের 'ইহবিতু মিসরান' শব্দের সাথেও মিলে যায়।
অর্থাৎ "হে আদম, হাওয়া ও ইবলিস, তোমরা সবাই এই বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পৃথিবীতে নেমে যাও।"
ব্রিটিশ নান জোয়ানা সাউথকোটের মতে, "এখন ইভকে সেই ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে যিনি শয়তানকে পরাজিত করেছিলেন এবং মানবতাকে মুক্ত করেছিলেন। ইভ অ্যাডামকে প্রলুব্ধ করেননি।"
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images
'হাওয়া আদমকে প্ররোচিত করেননি'
আমেরিকার গামিদি সেন্টার অব ইসলামিক লার্নিং–এর গবেষক নাঈম আহমদ বালুচ বিবিসিকে জানান, কোরান পড়ে বোঝা যায় যে আদম ও হাওয়া দুজনকেই প্ররোচিত করেছিল 'শয়তান'।
তিনি বলেন, "বাইবেলের (খ্রিস্টানদের পবিত্র গ্রন্থ) বিপরীতে কোরানে এমন কোনো ইঙ্গিত বা আয়াত নেই, যেখান থেকে বোঝা যায় যে হজরত আদম হজরত হাওয়ার কোনো কথার কারণে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে প্ররোচিত হয়েছিলেন"।
বাইবেলের কিছু গবেষকও স্বীকার করেন যে অ্য্যাডামকে ইভের প্রলুব্ধ করার ঘটনাটি স্বাভাবিক।
এই ঘটনার ব্যাখ্যায় নান জোয়ানা সাউথকোটও একই কথা বলেন। তার মতে, "সব অনিষ্টের মূল উৎস হলো সাপ, যা শয়তানের প্রতীক, ইভের নয়।"
১৮৬৯ সালে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ হ্যারিয়েট ল 'বাগ-ই-বেহেশত'-এ হাওয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
হ্যারিয়েট ল ইভকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীবাদের একটি প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
হ্যারিয়েট ল বলেন, "ইভ ছিলেন ইতিহাসের প্রথম নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ, যিনি সে সময় নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। এ কারণেই বাইবেলে বর্ণিত ইভকে বিশ্বের অনেক নারী আজও সম্মানের চোখে দেখেন।"
নারীবাদের পথিকৃৎ, পবিত্র গ্রন্থের অনুবাদক এবং সমকালীন শিক্ষাবিদদের মতে, পৃথিবীর প্রথম নারী হজরত হাওয়াকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার বলেন, "আজ ইভকে নতুনভাবে দেখা হচ্ছে।"
তিনি ইভকে এই পৃথিবীর মতো বলে অভিহিত করেছেন, যেখান থেকে সব ধরনের জীবনের জন্ম হয়েছে।
নান ও নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্ট বলেন, মানুষের উৎপত্তির ইতিহাসের নানা ঘটনায় ইভকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এর মধ্যে কিছু ব্যাখ্যায় তাকে দুর্বল, নিজের কামনা-বাসনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ঈশ্বরের আদেশ অমান্যকারী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদ ফাবিওলা রোডিন ১৯৯৫ সালে রিও ডি জেনেইরোর ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে উপস্থাপিত তার মাস্টার্স থিসিস 'দ্য ফেমিনিজম অব হোলিনেস'-এ যুক্তি দেন যে, "নারীবাদী ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে ইভ ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা গুরুত্বপূর্ণ মেরি।"
রোডিন উল্লেখ করেন, এই গুরুত্বের একটি কারণ হলো যে কাজটির দায় ইভের ওপর চাপানো হয়েছে, সেটিকেই পরবর্তীতে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে।
তবে রোডিন স্বীকার করেন যে, "অ্যাডাম ও ইভকে ঘিরে থাকা উপকথা ও বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যাকে নতুন করে উপস্থাপন করা একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কাজ।"
ফাবিওলা রোডিন তার মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য নারীবাদী দার্শনিক ইউভোন গেবহার্টের লেখালেখি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন।
ইউভোন গেবহার্টের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইভ ও মেরির মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায় এবং তাদেরকে "নারীত্বের দুই প্রতীক" হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রোডিন বলেন, "যদিও সাধারণভাবে ইভকে পাপী নারীর প্রতীক এবং মেরিকে পবিত্র নারীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, ইউভোন গেবহার্ট এমন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, যা এই প্রচলিত মূল্যায়নগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা ইভকে নারীত্বের শক্তির ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখি।"
তার মতে, মানুষের কাছে ইভের কাজকে অস্বস্তিকর হিসেবে দেখানো হয়, কারণ তা মানুষের দুর্বলতা, লোভকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থতা এবং মানুষের ভেতরে থাকা এক রহস্যময় শক্তিকে প্রকাশ করে।"
তিনি বলেন, "ইভের কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই দুর্বলতা ও রহস্য ইতিহাসজুড়ে সব নারীর ওপর আরোপ করা হয়েছে… প্রতিটি নারীকে একেকজন ইভ হিসেবে দেখা হয়, যিনি মানবজাতির পতন, দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা, লোভ ও পাপের কারণ।"
অন্যদিকে অধ্যাপক মারিয়া ক্লারা বেনজামার জোর দিয়ে বলেন, "এটি ইভের কাহিনির কেবল একটি অংশ মাত্র। তার চরিত্রে এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু রয়েছে।"
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, "বাইবেলও আসলে এই ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।"

ছবির উৎস, Getty Images
গবেষক নাঈম আহমদ বালুচের মতে, "কোরানের ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায়, আদম ও হাওয়া যে বাগানে অবস্থান করেছিলেন, সেটি জান্নাত ছিল না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো জান্নাতে শয়তান প্রবেশ করতে পারে না, কোরানের আয়াতে এ কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।"
তিনি বলেন, "কোরান থেকেই জানা যায় যে, মানুষকে খলিফা হিসেবে পৃথিবীতে নিয়োগ করাই ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। হজরত আদম ও হজরত হাওয়াকে তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা করার পরই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল, শাস্তি হিসেবে নয়।"
তোরাহর প্রথম গ্রন্থ জেনেসিস-এ লেখা আছে, "ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে হাওয়া বলে ডাকতেন, কারণ তিনিই ছিলেন সকল জীবের মা।"
তিনি এই শব্দটির পক্ষে ভাষাগত প্রমাণও তুলে ধরেন যে, হিব্রু ভাষায় 'হাওয়া' শব্দের অর্থ 'জীবন্ত' অথবা 'জীবনের উৎস'।
ইউভোন গেবহার্ট বলেন, "বিংশ শতকের পর থেকে আমরা পুরাণ ও উপকথাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে অধ্যয়ন করতে শুরু করেছি। এসব কাহিনির উদ্দেশ্য মানব অস্তিত্বের বহু রহস্য ব্যাখ্যা করা।"
তার মতে, "অন্যভাবে বললে, প্রত্যেক মানুষই অ্যাডাম, ইভ এবং প্রলুব্ধকারী সাপের প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো মানুষের স্বাধীনতার অনুসন্ধান এবং সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সীমা অতিক্রম করার প্রতীকও।"
তিনি বলেন, "অর্থাৎ আমরা শক্তি ও দুর্বলতা, ভয় ও কৌশল, প্রতিরোধ এবং নিজেকে বোঝার জন্য নিরন্তর অনুসন্ধানের এক সমন্বয়।"
গেবহার্টের ভাষায়, "আজ অ্যাডাম ও ইভকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, এই ধারণার ভিত্তিতে যে আমরা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি।"
তিনি যুক্তি দেন যে, মানবজাতির উচিত "বিদ্রোহ ও বীরত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজেদের সম্পর্কে একটি সম্মিলিত উপলব্ধিতে পৌঁছাতে দ্বৈততা কাটিয়ে ওঠা।"
সহজভাবে বললে মানুষের উচিত নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব দূর করে, বিদ্রোহ ও সাহসের সীমা ছাড়িয়ে নিজেকে ভালোভাবে বোঝা।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "ইভকে নায়িকা হিসেবে উপস্থাপন করা বা অ্যাডামকে দুর্বল কিংবা অন্য কোনো একতরফা তকমা লাগানো অত্যন্ত ভাসাভাসা সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি; এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে।"

ছবির উৎস, Getty Images
ধর্মতত্ত্ববিদ হোলি মোরিস তার বই 'দ্য বাইবেল অ্যান্ড ফেমিনিজম'-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সামনে এগোতে হলে আমাদের প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক ব্যাখ্যাগুলো ভেঙে দিতে হবে, যাতে প্রকৃত অর্থ উন্মোচন করা যায় এবং মূল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব হয়।
মধ্যযুগের শেষ দিকে ইতালীয় দার্শনিক ও কবি ক্রিস্তিনা দে পিজানো (১৩৬৩–১৪৩০) গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন যে, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির উৎকর্ষ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নারীদের বাদ দেওয়া যায় না।
এ কারণে তিনি হজরত হাওয়ার কাহিনি উল্লেখ করে যুক্তি দেন যে, নারীরাও পুরুষদের মতোই 'পরিপূর্ণ' বা 'নিখুঁত'। শুধু তাই নয়, তিনি ধর্মীয় যুক্তির মাধ্যমে বলেন যে, নারীদের অবমাননা করা মানে ঈশ্বরকে অবমাননা করা।
শ্যাভেজ ডিয়াজ বলেন, প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে কেবল রাজাদেরই 'ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি' হিসেবে দেখা হতো এবং অন্য মানুষদের তাদের সেবক হিসেবে গণ্য করা হতো।
সেই প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিপ্লবী ভাবনার প্রকাশ, যেখানে সব মানুষকেই 'ঈশ্বরের প্রতিচ্ছবি' হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
আদম ও হাওয়ার সৃষ্টি
মানবসৃষ্টির বিষয়ে তোরাহর দ্বিতীয় অধ্যায়ে হজরত আদমকে প্রথম সৃষ্ট মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শব্দগতভাবে 'আদম' নামের অর্থ হলো 'মাটি থেকে আহরিত', এবং এটি সমগ্র মানবজাতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
গবেষক নাঈম বালুচ বলেন, সূরা মারিয়ামের ৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিনি বোঝেন যে, পৃথিবী সৃষ্টি হয়ে বসবাসের উপযোগী হওয়ার পরই আল্লাহ এতে মানুষ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন।
তার মতে, "আর সূরা আলে ইমরানের ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যখন বলেন যে আদম ও হাওয়াকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন আমি এই 'মাটি' বলতে ধুলাবালি (ডাস্ট) বুঝি না; বরং এটিকে 'পার্থিব উপাদান' (আর্থলি ম্যাটেরিয়াল) হিসেবে দেখি। সে সময় মানুষ জানত না মাটির ভেতরে কী কী উপাদান রয়েছে। তাই এখানে মাটি বলতে শুধু মাটি নয়, এর মধ্যে পৃথিবীর সব খনিজ উপাদান ও উপকরণ অন্তর্ভুক্ত।"
পিজানো বলেন, "অ্যাডামকে একা দেখে ঈশ্বর তার জন্য একজন সঙ্গী সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেন। ঈশ্বর অ্যাডামকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন করেন, তার একটি পাঁজর নেন এবং সেখান থেকে নারীকে সৃষ্টি করেন।"
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, বাইবেলের অধিকাংশ অনুবাদে হিব্রু শব্দ 'ৎসেলা' (Tsela)-কে 'পাঁজর' হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।
"শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অনুবাদই এমন একটি ব্যাখ্যার ভিত্তি তৈরি করেছে, যার ফলে মনে করা হয়েছে যে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি হীনমন্যতায় ভোগেন।"
তিনি এই অংশটির বিকল্প অনুবাদ হিসেবে প্রস্তাব করেন—
"এরপর তিনি (ঈশ্বর) তার (হজরত আদমের) একটি পাঁজর নিয়ে তা মাংস দিয়ে ঢেকে দিলেন। পুরুষের দেহ থেকে নেওয়া সেই অংশ ব্যবহার করেই ঈশ্বর একজন নারীকে সৃষ্টি করলেন।"

ছবির উৎস, Getty Images
গবেষক নাঈম বালুচ বলেন, কোরানে হজরত হাওয়ার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে হজরত আদমের সঙ্গে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে তার নাম হাওয়া হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
ধর্মীয় আলেম পীর জিয়াউল হক নকশবন্দির মতে, বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম তাবারি ও হাফেজ ইবন কাসির আল্লাহ বাণীর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন যে, হজরত আদম (আ.) এর পাঁজর থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
একটি হাদিসে হজরত হাওয়ার সৃষ্টির বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নারীকে পুরুষের পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি সেটিকে সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও, সে বাঁকাই থাকবে। তাই নারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।"
নাঈম বালুচের মতে, এই হাদিসটি রূপক অর্থে বোঝায় যে নারীর প্রকৃতি কোমলতা ও সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত, এবং তার সঙ্গে ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আচরণ করা উচিত।
নকশবন্দি বলেন, "ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী হজরত হাওয়া মানবজাতির মা, আর সব মানুষই তার ও হজরত আদমের সন্তান"।
হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসে হজরত হাওয়ার নাম সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মানবজাতির মা, এবং তার জীবন থেকে আমরা শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচা ও আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা পাই।"

ছবির উৎস, Getty Images
হাওয়া ও আদম, একে অপরের সঙ্গী ও প্রশান্তির উৎস
হিব্রু পাঠ অনুযায়ী নারী হলো পুরুষের সঙ্গী।
শ্যাভেজ ডিয়াজ বলেন, "সাধারণভাবে মনে করা হয় এটি একটি ঈশ্বরীয় গুণ, অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের একমাত্র সাহায্যকারী, এবং তাকে ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। আর এটি নারীর কাজ হিসেবে বিবেচিত।"
সহজভাবে বললে মানুষ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারে না, আর নারীর কাজ হলো মানুষকে সাহায্য করা বা তার পাশে থাকা।
অনুবাদকরা আরেকটি স্থানের দিকে ইঙ্গিত দেন, যেখানে হিব্রু শব্দ কেনেকতো 'kenekto' ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হলো নারীকে পুরুষের জন্য উপযুক্ত সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি 'বিপরীত', 'সামনে', 'পিছনে', 'নিকটে' এই সব অর্থ বহন করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "অর্থাৎ নারীকে এমন হতে হবে যে, তিনি আপনার সামনে আপনার সমকক্ষ থাকবেন।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, হিব্রু পাঠ কখনো নারীদের ওপর পুরুষদের আধিপত্য বা পুরুষদের তুলনায় নারীর নিকৃষ্টতা বা অধীনতার স্বীকৃতি দেয় না।
গবেষক নাঈম বালুচ সূরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন যে, আল্লাহ বলেছেন:
"আর তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গী তৈরি করেছেন যাতে তোমরা তাদের মধ্যে প্রশান্তি পেতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিঃসন্দেহে এ বিষয়টি চিন্তাশীল মানুষদের জন্য নিদর্শন।"
মধ্যযুগের দার্শনিক ক্রিস্তিনা ডি পিসানো বলেন, এটি বলা ভুল যে পুরুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অ্যাডামকে ইভের আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুরুষ সৃষ্টির পর নারী সৃষ্টির করে ঈশ্বর তার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা আরো প্রসারিত করেছে।
শ্যাভেজ ডিয়াজ জোর দিয়ে বলেন, "বাইবেল একটি উন্মুক্ত গ্রন্থ। বাইবেল এবং এর অন্যান্য অংশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো মানুষকে জীবনের অর্থ, নিজেদের মধ্যে, ঈশ্বরের সঙ্গে, অন্যদের সঙ্গে এবং সৃষ্টির সঙ্গে পুরুষ ও নারীর ভূমিকা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করে।"
তিনি বলেন, "ইভ একটি প্রাচীন চরিত্র, যার মধ্যে বহু দিক এবং বিভিন্ন অর্থ নিহিত আছে। তার কাহিনি বোঝার জন্য মানুষকে জীবনের মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি সম্পর্কে চিন্তা করতে উৎসাহিত করা এবং চ্যালেঞ্জ করা গুরুত্বপূর্ণ।"








