গিয়াসউদ্দিন বলবন, যে তুর্কি দাস হয়ে উঠেছিলেন দিল্লির সুলতান

ছবির উৎস, NCERT
- Author, রেহান ফজল, বিবিসি হিন্দি
- পড়ার সময়: ৯ মিনিট
সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের কনিষ্ঠ পুত্র নাসিরুদ্দিন মাহমুদ সিংহাসনে আরোহণ করার সাথে সাথেই দিল্লির সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করে।
তবে, এ প্রক্রিয়ায় সুলতান মাহমুদের নিজের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না।
এই গুরুদায়িত্ব ছিল তার প্রধানমন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন বলবনের, সুলতান মাহমুদের শাসনামলে যিনি কার্যত ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন।
বলবন ১২৪৬ থেকে ১২৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর এই ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন।
এর মধ্যে প্রথম ২০ বছর তিনি সুলতানের বিশেষ প্রতিনিধি বা নায়েব হিসেবে এবং পরবর্তী দুই দশক তিনি নিজেই দিল্লির সুলতান হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
তবে, এর মাঝে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চক্রান্তের কারণে তাকে প্রায় দুই বছর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছিল।
বলবন যুগের সমসাময়িক ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনি তার লেখা 'তারিখ-ই-ফিরোজশাহী' গ্রন্থে লিখেছেন, "নাসিরুদ্দিন মাহমুদ যখন সিংহাসনে বসেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। রাজ্য শাসন করার মতো গুণাবলি বা আগ্রহ কোনোটিই তার ছিল না। তিনি রাষ্ট্রের সমগ্র প্রশাসন বলবনের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।"

ছবির উৎস, Primus Books
"মাহমুদ ছিলেন একজন ভদ্র, উদার এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি, যিনি তার সময়ের বেশিরভাগ অংশ কোরআনের অনুলিপি তৈরি করে ব্যয় করতেন। এ গুণগুলো যেকোনো মানুষের জন্য ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু একজন সুলতান হওয়ার জন্য এগুলো অনুপযুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছিল।
বলবন তার প্রতিদ্বন্দ্বী দরবারীদের ঈর্ষা এবং ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।"
মঙ্গোলরা যখন বাগদাদের দাস বাজারে বলবনকে বিক্রি করে দিয়েছিল
নাসিরুদ্দিন মাহমুদের ২০ বছরের শাসনামলে মূলতঃ বলবনই ছিলেন প্রকৃত শাসনকর্তা।
ইতিহাসবিদ বারনি লিখেছেন, "এ সময়কালে বলবন কার্যতঃ মাহমুদকে একটি পুতুল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ প্রশাসন পরিচালনা করতেন এবং সুলতান না হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত রাজকীয় প্রতীক ও অন্যান্য সুবিধা ব্যবহার করতেন, যেমন তিনি রাজকীয় ছাতা ব্যবহার করতেন।
এক অর্থে মাহমুদের পুরো শাসনকালটা ছিল আসলে বলবনেরই শাসনকাল।'

ছবির উৎস, Penguin Books
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গিয়াসউদ্দিন বলবন আল-বারি ১২১৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি ছিলেন একজন তুর্কি। তার প্রকৃত নাম ছিল বাহাউদ্দিন।
মঙ্গোলরা তাকে বন্দি করে বাগদাদে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। বলবনের মালিক খাজা জামালউদ্দিন তাকে দিল্লিতে নিয়ে আসেন, যেখানে ১২৩৩ সালে ইলতুতমিশ তাকে কিনে নেন এবং নিজের বিশ্বস্ত অনুচরে পরিণত করেন।
ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর তার কন্যা রাজিয়া বলবনকে 'আমীর-ই-শিকার' পদে নিযুক্ত করেন।
এরপর ১২৪৯ সালে তিনি সুলতান নাসিরুদ্দিনের কন্যাকে বিয়ে করেন।
নাসিরুদ্দিন মাহমুদ তাকে 'নায়েব-উল-মুলক' পদে নিযুক্ত করেছিলেন। এই পদমর্যাদা পাওয়ার পর বলবন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তার পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে শুরু করেন।
তিনি তার ছোট ভাই কুশলি খানকে রাজপ্রাসাদ প্রশাসনের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন।
মরক্কো থেকে ওই একই সময়ে ভারতে আসা বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার মতে, 'বলবন ছিলেন খর্বাকৃতির একজন মানুষ, যিনি দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় ছিলেন না, তবে তার উচ্চ মানসিক ক্ষমতা এবং প্রতিভা সে ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছিল।'
ইতিহাসবিদ মিনহাজ সিরাজ তার 'তাবাকাত-ই-নাসিরি' বইয়ে লিখেছেন, "ইলতুতমিশ বলবনকে অত্যন্ত মেধাবী একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন, তাই তিনি বলবনকে উচ্চপদ প্রদান করেন এবং এক অর্থে তার ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নেন।"
দিন দিন বলবনের পদমর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি 'তুর্কান-ই-চিহালগানি'-র সদস্য হন। এটি মূলতঃ ৪০ জনের একটি দল যারা সুলতানকে পরামর্শ প্রদান করতেন।'
তবে, স্বাভাবিকভাবেই বলবনের প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার প্রভাব-প্রতিপত্তির এই দ্রুত উত্থান পছন্দ করেননি এবং তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেছিলেন।

ছবির উৎস, NCERT
প্রতিদ্বন্দ্বীদের আস্থা অর্জন করেছিলেন বলবন
ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্রের 'হিস্ট্রি অফ মিডেইভাল ইন্ডিয়া' বইয়ে লিখেছেন, "নাসিরুদ্দিন মাহমুদের সভাসদগণ সুলতানের কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হয়ে বলবনকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেন। বলবনের স্থলাভিষিক্ত হন ইমাদুদ্দিন রায়হান।
তুর্কি সর্দাররা সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে চাইলেও, তাদের মধ্যে কে বলবনের আসনে বসবেন - তা নিয়ে একমত হতে পারেননি। ফলে তারা রায়হানের নিয়োগে সম্মত হন।'
বলবন তার পদচ্যুতিতে বাধা দেননি, কিন্তু দেড় বছরের মধ্যেই তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কয়েকজনের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। বলবনের সহযোগীদের ক্রমবর্ধমান শক্তির কারণে এক পর্যায়ে সুলতান মাহমুদ রায়হানকে তার পদ থেকে অপসারণ করেন।
এর কিছুকাল পরে রায়হানকে হত্যা করা হয়। এভাবে বলবন তার অনেক বিরোধীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন, লিখেছেন ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র।
১২৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুলতান মাহমুদের মৃত্যু পর্যন্ত বলবন এই পদে বহাল ছিলেন।
মৃত্যুর আগে সুলতান মাহমুদ বলবনকে তার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। এর কারণ ছিল ইলতুতমিশের কোনো জীবিত পুত্র ছিল না এবং বলবনের মতো কেউই কেবল দিল্লির মসনদ ঘিরে চলা বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে পারতেন।
তারওপর, বলবন তুর্কি বীর আফ্রাশিয়াবের বংশধর দাবি করে সিংহাসনের ওপর তার অধিকার আরও জোরালো করে তুলেছিলেন।
সুলতান হিসেবে বলবন অত্যন্ত দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছিলেন। সুলতান হওয়ার সাথে সাথেই তিনি সেই সমস্ত বিলাসিতা ত্যাগ করেন, যেগুলোতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন।
ইতিহাসবিদ জিয়াউদ্দীন বারনি লিখেছেন, "সভাসদ হিসেবে বলবন মদ্যপান এবং বিভিন্ন ধরনের আমোদ-প্রমোদে আসক্ত ছিলেন। তিনি সপ্তাহে তিনবার ভোজসভার আয়োজন করতেন এবং অতিথিদের সাথে জুয়া খেলতেন।
কিন্তু সিংহাসনে আরোহণ করার পরপরই তিনি এসব ব্যসন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। তার কেবল একটিই শখ অবশিষ্ট ছিল, সেটি হচ্ছে শিকার, যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন এবং যার মাধ্যমে তিনি তার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিতেন।"

ছবির উৎস, Getty Images
জয়ের পূজারী
ইলতুতমিশ ছাড়া দিল্লির অন্য সুলতানরা প্রায় সকলেই সভাসদদের সমানভাবে দেখতেন।
কিন্তু, বলবন বিশ্বাস করতেন যে, এর ফলে প্রশাসনে শিথিলতা এবং সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
সভাসদ ও প্রাদেশিক গভর্নররা সর্বক্ষণ সুলতানের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতেন, যা তার ক্ষমতার কেন্দ্রকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
প্রাচীন ইরানি রাজদরবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, বলবন অনুভব করেছিলেন যে মর্যাদার দিক থেকে সিংহাসন হওয়া উচিত সভাসদদের ঊর্ধ্বে।
তিনি ক্রমে সুলতানকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।
বারনি লিখেছেন, "বলবনের রাজতন্ত্রের ধারণাটি এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিল যে, যখনই সভাসদগণ সুলতানের সামনে আসবেন, তখন তাদের নতজানু হতে হবে এবং সিংহাসন অথবা সুলতানের পা চুম্বন করতে হবে।
বলবন দরবারে বা অন্য কোনো জনসমক্ষে যেখানেই থাকুন না কেন, তিনি সর্বদা তলোয়ারধারী রাজকীয় দেহরক্ষী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। তিনি সুলতান এবং অন্যদের মধ্যে একটি শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছিলেন।"
"দিল্লির কোনো শাসকই এর আগে কখনো এমন জাঁকজমক প্রদর্শন করেননি। তার ভৃত্যরা আমাকে বলেছিল যে, যখন কেউ তাকে দেখতে পেত না, তখনও তিনি রাজকীয় পোশাক পরিধান করে থাকতেন।"
'নিচু বংশের কাউকে দেখলেই হাত তরবারিতে চলে যায়'
নিজের শাসনামলজুড়ে বলবনকে কখনো তার পদমর্যাদার নিচে থাকা কারো সাথে কথা বলতে দেখা যায়নি, কিংবা অচেনা মানুষের সাথে মেলামেশা করতেও দেখা যায়নি।
ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র লিখেছেন, "বলবন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার পদগুলো থেকে সকল ভারতীয় মুসলিমদের বহিষ্কার করেছিলেন। যারা অভিজাত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, সরকারি পদে তাদের নিয়োগ দেওয়া তিনি বন্ধ করে দেন।
এমনকি অনেক সময় তিনি উচ্চবংশীয় নন, এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীদের সাথেও দেখা করতে অস্বীকার করতেন।"

ছবির উৎস, Orient Black Swan
বলবনকে উদ্ধৃত করে ইতিহাসবিদ বারনি লিখেছেন, "যখনই আমি কোনো নিম্নবংশীয় মানুষকে দেখি, আমার চোখ জ্বলে ওঠে এবং আমার হাত তলোয়ারের দিকে চলে যায়।"
বলবন মানুষের সাথে ঠাট্টা-তামাশা করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
তার উপস্থিতিতে একে অপরের সাথে রসিকতা করার সাহস কারও ছিল না। তিনি তার দরবারে নিজে কখনো উচ্চস্বরে হাসতেন না এবং অন্য কাউকে হাসতেও দিতেন না।
বলবন তার সাম্রাজ্যের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সতর্কভাবে গুপ্তচরদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন, যাতে কোনো সম্ভাব্য বিদ্রোহ সম্পর্কে তিনি সর্বদা অবহিত থাকতে পারেন।
সামরিক অভিযানের বিপরীত নীতি
অন্যান্য সুলতান বা রাজাদের মতো যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ছিল না বলবনের।
ঐতিহাসিক আব্রাহাম ইরালির মতে, "এর কারণ এটি নয় যে তিনি সামরিক অভিযানের বিরোধী ছিলেন। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নতুন রাজ্য জয়ের পেছনে সময় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বিশেষ করে যখন নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলোই পুরোপুরি স্থিতিশীল ছিল না এবং নিয়মিত মঙ্গোলদের আক্রমণের আশঙ্কায় থাকতো।"
ঐতিহাসিক বারনি লিখেছেন, একবার বলবনের সভাসদগণ যখন তাকে কোনো একটি সামরিক বিজয় অর্জন করে ইতিহাসে নিজের নাম চিরস্মরণীয় করে রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তখন বলবন সে প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
বলবন বলেছিলেন, "আমি আমার সাম্রাজ্যের সমস্ত আয় সেনাবাহিনী শক্তিশালী করার পেছনে ব্যয় করেছি। মঙ্গোল আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য আমার বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত। আমি কখনোই আমার সাম্রাজ্য ত্যাগ করে কোথাও যাব না।"

ছবির উৎস, Penguin India
চেঙ্গিস খানের নাতির সাথে সুসম্পর্ক
দিল্লি সালতানাতের উজির ও পরবর্তীতে সুলতান হিসেবে বলবন অত্যন্ত বিচক্ষণ কূটনীতি, সতর্কতা এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মঙ্গোলদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলেন।
তার এই কৌশলী অবস্থানের কারণেই মঙ্গোলরা তার সাম্রাজ্যের বড় কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
আব্রাহাম ইরালি লিখেছেন, "বলবন সবসময় ইরানে মঙ্গোলদের প্রতিনিধি এবং চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। হালাকু তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, মঙ্গোলরা শতদ্রু নদী অতিক্রম করে আর সামনে অগ্রসর হবে না।"
১২৫৯ সালে হালাকু খান দিল্লিতে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান, যাদের বলবন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
তবে তিনি কখনোই মঙ্গোলদের এমন কোনো ধারণা হতে দেননি যে দিল্লি সামরিকভাবে কোনো দিক থেকে দুর্বল।
মেওয়াতি দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান
বলবনের শাসনামলে মেওয়াত অঞ্চলের মানুষ দিল্লির আশেপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।
ঐতিহাসিক বারনি লিখেছেন, "মেওয়াতিরা দিল্লির চারপাশের গ্রামীণ এলাকায় ডাকাতি করত। তারা ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকত, যেখান দিয়ে অনেক রাস্তা চলে গিয়েছিল। তারা পথচারীদের অতর্কিতে আক্রমণ করত এবং তাদের মালপত্র লুট করে নিত।
তাদের ভয়ে দিল্লির পশ্চিম দিকের ফটকগুলো আসরের নামাজের পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হতো। বলবনের কাছে এই ডাকাতদের ধৃষ্টতা একেবারেই পছন্দনীয় ছিল না।"
'তাদের দমন করার জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন। টানা ২০ দিন ধরে বলবনের সৈন্যরা মেওয়াতিদের দুর্গে আক্রমণ চালায়।
সৈন্যদের উৎসাহ দিতে বলবন ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রতিটি মেওয়াতি ডাকাতের মাথার বিনিময়ে একটি স্বর্ণমুদ্রা এবং জীবিত অবস্থায় বন্দি করতে পারলে দুটি স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হবে।
এর ফলে অনেক মেওয়াতি দস্যুকে বন্দি করে দিল্লিতে আনা হয় এবং অনেককে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে বলবন দিল্লির চারপাশের সমস্ত জঙ্গল কেটে ফেলেন এবং সেখানে সামরিক চৌকি স্থাপন করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলার বিদ্রোহ দমন
বলবন বৈদেশিক আক্রমণকারীদের তুলনায় তার প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের কাছ থেকে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
বাংলা ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, তাই বলবন তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর তুঘরিল খানকে এর শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।
তুঘরিল ছিলেন একজন উদ্যমী এবং নির্ভীক মানুষ, কিন্তু বাংলায় পৌঁছানোর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বলবনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
ইতিহাসবিদ বারনি লিখেছেন, "বলবন তখন তুঘরিলকে দমন করার জন্য অযোধ্যার শাসনকর্তা আমিন খানকে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তুঘরিল তাকে সহজেই পরাজিত করেন।
এরপর বলবন নিজে বিদ্রোহ দমন করতে বাংলায় যান। বলবন যখন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে সেখানে পৌঁছান, তখন তুঘরিল এই আশায় ত্রিপুরার দিকে পালিয়ে যান যে বলবন তাকে ধাওয়া করবেন না। কিন্তু বলবন তাকে অনুসরণ করেন এবং হত্যা করেন।"
তুঘরিলের বন্দি সৈন্যদের নিয়ে বলবন লক্ষ্মণাবতীতে ফিরে আসেন। ভবিষ্যতে কেউ যেন বিদ্রোহ করার সাহস না পায়, সেজন্য তিনি প্রধান বাজারের দুই পাশে ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করেন এবং তুঘরিলের সমস্ত পুত্র ও জামাতাদের ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দেন।
ছেলের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলবন
বলবনকে দিল্লির সাম্রাজ্যের প্রশাসন সংস্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়।
তিনি প্রশাসনের মর্যাদা পুনরদ্ধার করেছিলেন। তার কঠোর আইন এবং অটল আইনের প্রয়োগ উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত নির্বিশেষে সকল নাগরিককে তার কর্তৃত্বের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করেছিল।
বলবন অত্যন্ত সম্মান এবং ক্ষমতার সাথে দিল্লি শাসন করেছিলেন।
১২৮৫ সালে মুলতানে মঙ্গোলদের সাথে এক যুদ্ধে বলবনের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মুহাম্মদ নিহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনা বলবনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
বারনি লিখেছেন, "তিনি এই শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি।
দিনের বেলা তিনি এমনভাবে দরবার পরিচালনা করতেন, যেন সবকিছু স্বাভাবিক আছে, কিন্তু রাতে তিনি শোকে চিৎকার করে কাঁদতেন, নিজের কাপড় ছিঁড়ে ফেলতেন এবং নিজের মাথায় ময়লা ছুঁড়ে মারতেন।
ক্রমে বলবনের শাসনকাল সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

ছবির উৎস, NCERT
৭১ বছর বয়সে মৃত্যু
মুহাম্মদের মৃত্যুর দুই বছর পর, ১২৮৭ সালে বলবনও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
তিনি তার দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন।
তিনি তাকে ডেকে বলেছিলেন, "তোমার ভাইয়ের মৃত্যু আমাকে মৃত্যুশয্যায় নিয়ে এসেছে, যেকোনো মুহূর্তে আমার জীবন প্রদীপ নিভে যেতে পারে। তোমার দূরে চলে যাওয়ার সময় এখন নয়, কারণ তুমি ছাড়া আমার আর কোনো পুত্র নেই। তোমাকে অবশ্যই আমার সাথে থাকতে হবে। লখনৌতি (যার প্রাচীন নাম লক্ষ্মণাবতী) যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করো।"
কিন্তু বুঘরা খান পিতার উপদেশ মানেননি।
বারনি লিখেছেন, "তিনি ছিলেন এক উদাসীন রাজকুমার। দিল্লির সিংহাসনের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ ছিল না। দিল্লিতে দুই মাস থাকার পর, যখন মনে হলো বলবনের স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে, তখন তিনি তার পিতাকে না জানিয়েই লখনৌতিতে ফিরে যান।"
বলবন তার সভাসদদের ডেকে পাঠান এবং তার নাতি খসরুকে সিংহাসনের জন্য প্রস্তুত করতে বলেন।
বলবন বলেছিলেন, "আমি জানি সে অল্পবয়সী এবং শাসনের জন্য অনুপযুক্ত, কিন্তু আমি আর কী করতে পারি?"
এর তিন দিন পর সুলতান বলবন চিরতরে চোখ বুজেছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images








