কেরালার নিপাহ্ ভাইরাসকে কেন ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’ বলা হচ্ছে

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

দক্ষিণ ভারতের কেরালাতে নতুন করে নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পর ওই রাজ্যের সরকার সেটিকে বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাস বলে দাবি করেছে।

কেরালার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভিনা জর্জ রাজ্যের বিধানসভায় একটি প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানিয়েছেন, যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা তাদের সংস্থাগুলো এখনও সেটি নিশ্চিত করেনি।

পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি থেকে বিশেষজ্ঞদের দল ইতোমধ্যেই কেরালাতে গিয়ে পৌঁছেছেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। মোবাইল ল্যাবরেটরি স্থাপন করে ও বাদুড়দের ওপর জরিপ চালিয়ে তারা ভাইরাসটির প্রকৃতি ও ধরন নিশ্চিত করতে চাইছেন।

তবে কেরালা সরকার জানাচ্ছে এই দফায় তাদের রাজ্যে ভাইরাসের যে ধরন বা ভ্যারিয়েন্টটির প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে সেটির সঙ্গে বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্টের মিল আছে বলেই সেটিকে ওই নামে শনাক্ত করা হচ্ছে।

কেরালার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট নিপাহ্ ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য মূলত তিনটি।

প্রথমত, এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে।

দ্বিতীয়ত, এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে মর্টালিটি রেট, অর্থাত্ আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি।

তৃতীয়ত, এটি কিন্তু তেমন সংক্রামক নয় – সুতরাং ইনফেকশন খুব একটা দ্রুত বেগে ছড়ায় না।

কেরালার থোনাক্কালে ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ভাইরোলজি রাজ্যের নিপাহ্ আক্রান্ত কেসগুলো নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও টেস্টিং চালিয়েছে।

ওই সংস্থার প্রধান ই শ্রীকুমার এদিন (বৃহস্পতিবার) বিবিসি বাংলাকে জানান, “আক্রান্ত এলাকায় কনট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের কাজ চলছে, তবে বাংলাদেশ থেকে আগত কারও মাধ্যমে কেরালাতে ওই ভাইরাস ছড়িয়েছে সেটা কিন্তু বলা হচ্ছে না।”

“ভাইরাসের ধরনটির সঙ্গে নিপাহ্-র বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্টের প্রচুর মিল আছে বলেই সেটিকে ওই নামে শনাক্ত করা হচ্ছে”, বলছিলেন মি শ্রীকুমার।

কেরালায় গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই নিয়ে চতুর্থবার নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা ঘটল – যার মোকাবিলায় রাজ্য সরকার এবার শুরু থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।

পুলিশ ঘিরে রেখেছে সাতটি গ্রাম

নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে কেরালার কোঝিকোড় জেলার সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাকে পুলিশ এখন কর্ডন অফ করে রেখেছে।

ওই এলাকাটিকে কনটেইনমেন্ট জোন ঘোষণা করে সেখানে ব্যাঙ্ক, সরকারি অফিস-কাছারি, স্কুল-কলেজ, দোকানপাট সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর ওষুধপত্র সরবরাহ অব্যাহত আছে।

এই সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েত হল আতানচেরি, মারুথোনকারা, তিরুভাল্লুর, কুট্টয়িাডি, কায়াক্কোডি, ভিলিয়াপাল্লি ও কাভিলামপারা।

গত ৩০শে অগাস্ট এই এলাকারই একজন বাসিন্দা নিপাহ্ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন বলে এখন সন্দেহ করা হচ্ছে।

প্রথমে ভাবা হয়েছিল ওই ব্যক্তি বোধহয় লিভার সিরোসিস-জনিত কোমর্বিডিটিতে মারা গেছেন। কিন্তু দিনকয়েক পরে তার ন’বছর বয়সী ছেলে নিপাহ্ ভাইরাসের সিম্পটম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ওই মৃত্যু নিয়েও সন্দেহ দানা বাঁধে।

ওই বাচ্চা ছেলেটি এখন আইসিইই-তে ভর্তি আছে। তাদের পরিবারের আরও একজন সদস্যও নিপাহ্-তে আক্রান্ত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজ্যে কম করে চারটি নিপাহ্ সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে বলে কেরালা সরকার নিশ্চিত করেছে, যার সবগুলোই কোঝিকোড় জেলায়। এর মধ্যে দুজন ব্যক্তি মারাও গেছেন।

কেরালাতে গত কয়েক বছর ধরেই নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘুরেফিরে আসার পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিন্নারাই বিজয়নও স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক।

তবে তিনি সেই সঙ্গেই বলেছেন, “আমি রাজ্যবাসীকে বলব প্যানিক করার বা আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কোনও দরকার নেই। সরকার সব ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।”

নিপাহ্-র সংক্রমণ যাতে পাশের রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে না-পড়ে সে জন্য কেরালার প্রতিবেশী কর্নাটক ও তামিলনাডুও সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে।

কে নিশ্চিত করল বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট?

কেরালায় এবার নিপাহ্ ভাইরাসের যে ধরনটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিকে বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মূলত দুটি প্রতিষ্ঠানের চালানো পরীক্ষার ভিত্তিতে – যে দুটোই রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন।

এই দুটো প্রতিষ্ঠান হল কোঝিকোড় মেডিক্যাল কলেজ এবং থোন্নাকালে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ভাইরোলজি।

তবে রাজ্য সরকার নিজেরাই বিধানসভায় স্বীকার করেছে, এই দুটো প্রতিষ্ঠানের কারওরই নিপাহ্ সংক্রমণ যে হয়েছে – সেটা ঘোষণা করার এক্তিয়ার নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভিনা জর্জ জানিয়েছেন, “আমাদের এই দুটো প্রতিষ্ঠানেরই নিপাহ্ কেস পরীক্ষা করার মতো উপযুক্ত ল্যাব ও সামর্থ্য আছে – তবে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের নিপাহ্ কনফার্ম করার ক্ষমতা এখনো দেয়নি।"

ভারত সরকারের নিয়ম অনুসারে, দেশের কোনও এলাকায় নিপাহ্ (বা ওই জাতীয় কোনও ভাইরাস) সংক্রমণ হয়েছে, সেটা ঘোষণা করার এক্তিয়ার আছে কেবলমাত্র পুনের ইনস্টটিটিউট অব অ্যাডভান্সড ভাইরোলজির – যেটি একটি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান।

পুনের ওই ইনস্টিটিউট থেকে বিশেষজ্ঞদের একটি দল ইতোমধ্যেই কোঝিকোড়ে পৌঁছে গেছেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন।

এছাড়া তামিলনাডু থেকেও একদল এপিডেমিওলজিস্ট বা মহামারি বিশেষজ্ঞকেও কেরালাতে পাঠানো হয়েছে।

ভারতে পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, কেরালা সরকার তাদের রাজ্যে প্রাদুর্ভাব-হওয়া নিপাহ্ ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট পর্যন্ত বিধানসভায় ঘোষণা করে দেওয়ার আগে এই বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করলেই ভাল করতেন।