যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পেতে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসীদের সমকামী সেজে থাকার পরামর্শ আইনজীবীদের, বিবিসির অনুসন্ধান

- Author, বিলি কেনবার
- Role, রাজনীতি বিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদক
- Author, ফিল কেম্প
- Role, রাজনীতি বিষয়ক প্রতিবেদক
- পড়ার সময়: ১২ মিনিট
সমকামী সেজে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হিসেবে আশ্রয় পেতে সহায়তা করার বিনিময়ে হাজার হাজার পাউন্ড নেওয়া হচ্ছে- আইন সংস্থা ও উপদেষ্টাদের এমন একটি বিশাল চক্রের তথ্য বেরিয়ে এসেছে বিবিসির অনুসন্ধানে।
একটি বড় গোপন অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে আমরা দেখিয়েছি, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, তাদের বানানো কাহিনি দেওয়া হচ্ছে বলার জন্য এবং সাজানো প্রমাণ জোগাড়ের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে- এর মধ্যে রয়েছে সমর্থনপত্র, ছবি ও চিকিৎসা প্রতিবেদন।
এরপর তারা পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ফিরলে প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে- এই যুক্তিতে সমকামী হিসাবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে আশ্রয়ের আবেদন করছেন।
আমাদের অনুসন্ধানের জবাবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, "যারা এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা হবে- যার মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে অপসারণের মতো পদক্ষেপ রয়েছে।"
যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থায় তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, যারা নিজ দেশে ফিরে গেলে ঝুঁকিতে পড়বেন-যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সমকামিতা অবৈধ।
তবে বিবিসি নিউজের তদন্তে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে থাকতে চাওয়া অভিবাসীদের কাছ থেকে ফি আদায় করে আইন উপদেষ্টারা পদ্ধতিগতভাবে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করছেন।
এদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, কর্মজীবী বা পর্যটক ভিসায় যুক্তরাজ্যে ছিলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। তারা ছোট নৌকায় বা অন্য অবৈধ পথে সদ্য আসা লোকজন নন। এখন এই গোষ্ঠীই সব আশ্রয় আবেদনের ৩৫ শতাংশ, ২০২৫ সালে যার সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।
প্রাথমিক প্রমাণ ও তথ্যের সূত্র পাওয়ার পর আমরা গোপনে প্রতিবেদক পাঠাই এটা জানতে যে, অভিবাসন উপদেষ্টারা কতটা আগ্রহী হয়ে ভুয়া আশ্রয় দাবি বানাতে সাহায্য করেন।
প্রতিবেদকরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেজে যান—যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে।
তদন্তে যা জানা গেছে:
- একটি আইন সংস্থা ভুয়া আশ্রয় আবেদন বানাতে সর্বোচ্চ সাত হাজার পাউন্ড দাবি করেছে। তারা বলেছে, এর ফলে স্বরাষ্ট্র দপ্তরে প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা "খুবই কম"।
- ভুয়া আশ্রয়প্রার্থীরা বিষণ্নতায় অসুস্থ থাকার ভান করে চিকিৎসকদের কাছে গিয়েছেন, যাতে মামলা জোরদার করতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে পারেন। এমনকি একজন নিজেকে এইচআইভি পজিটিভ বলেও মিথ্যা বলেছেন।
- এক ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা গর্ব করে বলেছেন, তিনি ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে ভুয়া দাবি তৈরি করতে সাহায্য করছেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, গ্রাহকের সঙ্গে সমকামী যৌন সম্পর্কে জড়িত ছিলেন—এমন সাজানো কাউকে তিনি জোগাড় করেও দিতে পারেন।
- আমাদের আন্ডারকভার প্রতিবেদককে এমনও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার পর তিনি পাকিস্তান থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারবেন এবং পরে স্ত্রীকে লেসবিয়ান সাজিয়ে ভুয়া দাবি করা যাবে।
- আরেক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এক আইনজীবী বলেন, তিনি সমকামী বা নাস্তিক সেজে সফলভাবে আশ্রয় পেতে মানুষকে সহায়তা করেছেন। তিনি ১৫০০ পাউন্ড ফিতে ভুয়া দাবি করতে সাহায্যের প্রস্তাব দেন এবং প্রমাণ বানাতে আরও দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড লাগবে বলে জানান।
'এখানে কেউই সমকামী নয়'
পূর্ব লন্ডনের বেকটনের এক শান্ত এলাকায় অবস্থিত একটি কমিউনিটি সেন্টারে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় একটি অনুষ্ঠানে ১৭৫ জনের বেশি মানুষ জড়ো হন।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাউথ ওয়েলস, বার্মিংহাম ও অক্সফোর্ডের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকেও এসেছেন, উরচেস্টার এলজিবিটি আয়োজিত একটি সভায় অংশ নিতে। সংগঠনটি নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি সহায়তাগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দেয়।

এই গ্রুপের ওয়েবসাইটে বলা হয়, শুধুমাত্র প্রকৃত সমকামী আশ্রয়প্রার্থীরাই স্বাগত। কিন্তু বাইরে রাস্তায় আমাদের আন্ডারকভার প্রতিবেদকের কাছে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পুরুষরা সহজেই স্বীকার করেন—বাস্তবতা ভিন্ন।
"এখানে বেশিরভাগই সমকামী নয়," বলেন ফাহার নামে একজন।
আরেকজন, যিনি নিজেকে জিশান বলেন, আরও স্পষ্ট: "এখানে কেউই সমকামী নয়। এক শতাংশও না। ০.০১ শতাংশও না।"
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আমাদের প্রতিবেদকের এই সভায় যাওয়ার শুরুটা হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে—বার্মিংহাম ও লন্ডনভিত্তিক ইমিগ্রেশন আইন সংস্থা ল অ্যান্ড জাস্টিস সলিসিটরস-এর প্যারালিগ্যাল মাজেদুল হাসান শাকিলের কাছে যাওয়ার মাধ্যমে।
আইনি কাজের পাশাপাশি শাকিল উরচেস্টার এলজিবিটি এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিনি কমিউনিটি গোষ্ঠীর ওয়েবসাইটে নিজের আইনি সেবার প্রচার করতেন।
একটি সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে শাকিল বলেন, আশ্রয় চাইতে হলে নির্যাতনের আশঙ্কা থাকতে হবে এবং আমাদের প্রতিবেদকের সে ধরনের ভিত্তি আছে বলে মনে হয়নি।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, অপ্রত্যাশিতভাবে, নিজেকে তানিসা বলে পরিচয় দেওয়া একজন ফোন করেন।
এরপর তার সাথে উর্দুতে কথাবার্তা হয়। তিনি অনেক বেশি আগ্রহ দেখান—সমকামী পরিচয়ের ভিত্তিতে কীভাবে আশ্রয়ের আবেদন করা যায়, তা ব্যাখ্যা করেন।
প্রতিবেদক যখন বলেন, তিনি সমকামী নন, তানিসা বলেন, "আমার কথা শোনো। এখানে কেউই আসল নয়। এখন এখানে বাঁচার একটাই পথ এবং সেটাই সবাই নিচ্ছে।"
কে তার নম্বর দিয়েছে-এ প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও, হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল ছবি ও প্রথম নাম মিলিয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে তিনি উরচেস্টার এলজিবিটি'র উপদেষ্টা তানিসা খান।
'একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ'
সেই সন্ধ্যায় তানিসার সঙ্গে প্রাথমিক পরামর্শের জন্য প্রতিবেদক যান পূর্ব লন্ডনের ফরেস্ট গেটে। প্রথম বৈঠকটি কোনো আইনি পরামর্শক সংস্থার দপ্তরে নয়, বরং অনুষ্ঠিত হয় তার নিজের বাড়ির শোবার ঘরে।
"এই মুহূর্তে ভিসা পাওয়ার একটাই পথ খোলা—আশ্রয় ভিসা… মানবাধিকারভিত্তিক, যাকে বলা হয় গে কেস বা একই লিঙ্গ," তিনি বলেন, "অন্য কোনো ভিসার আশা নেই"।
তিনি জানান, হোম অফিসের সাক্ষাৎকারের জন্য বানানো গল্প মুখস্থ করতে হবে; "পরীক্ষা দিতে তোমাকেই যেতে হবে… আমি সব প্রস্তুত করে দেব"।
৪৫ মিনিটের এই আলোচনায় বোঝা যায় যে ভুয়া আশ্রয় দাবির প্রতারণা কতটা জটিল হতে পারে, আর তাই তা শনাক্ত করা কর্মকর্তাদের জন্য কতটা কঠিন।

হোম অফিস প্রথমে স্ক্রিনিং সাক্ষাৎকার নেয়, এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে "মূল সাক্ষাৎকার"—যেখানে দাবির খুঁটিনাটি প্রশ্ন করা হয়। প্রত্যাখ্যান হলে আদালতে আপিল করা যায়।
"কেউ সমকামী কি না, তা যাচাইয়ের কোনো পরীক্ষা নেই," বলেন তানিসা। "মূল বিষয় হলো—তুমি কী বলছো। বলতে হবে, 'আমি সমকামী, এটাই আমার বাস্তবতা'।"
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ছবি, ক্লাবের টিকিট, সমর্থনপত্র-সব মিলিয়ে একটি "পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ" তৈরি হবে।
তানিসা দাবি করেন যে তিনি ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভুয়া অভিযোগ আনতে সাহায্য করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে এলজিবিটি অনুষ্ঠানে আমাদের প্রতিবেদকের তোলা ছবি এবং সেগুলোর জন্য তার কেনা টিকিটগুলো তার আবেদনের অংশ হিসেবে প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন, "আমি আপনাকে একজনের কাছ থেকে একটি চিঠি দেব, যার সাথে আমরা কয়েকটি ছবি তুলব এবং সেই ব্যক্তি লিখবে যে সে আপনার সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে।"
তানিশার এই সেবার দাম আড়াই হাজার পাউন্ড। আর আবেদন নাকচ হলে আপিলে গেলে খরচ আরও বাড়বে। সফল হলে কাজ, বসবাস, ভাতা সবই মিলবে, তিনি বলেন।
প্রতিবেদক স্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন করলে তানিসা বলেন, "ওকে এখানে আনলে, ওরও আশ্রয় করব… ওকে লেসবিয়ান বানাব"।
প্রমাণ জোগাড়
তানিসা কোনো নিবন্ধিত ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা নন। ফলে তার এমন পরামর্শ দেওয়া বেআইনি।
সকালে যে আইনজীবীর কাছে আমরা টেলিফোন করেছিলেন, তার সাথে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি যে গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন, তাতে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি তার সাথে কাজ করেন।
''আইনজীবীরা আপনাকে পথ দেখিয়ে দেবে। কিন্তু আসল ফিল্ডওয়ার্ক তারা করেন না,'' বানোয়াট নথিপত্রের প্রসঙ্গে তিনি বলেন।
''ফিল্ডওয়ার্ক আমাদেরই করতে হয়,'' তিনি বলেন।
পরে ল অ্যান্ড জাস্টিস এর ইলফোর্ড অফিসে হওয়া বৈঠকগুলোতে শাকিলের সঙ্গে তার যোগসূত্র স্পষ্ট হয়। ওই আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানেই শাকিল কাজ করেন।
''আমি একজন আইনজীবীর সাথে কাজ করি, তাই তার অফিস ব্যবহার করি,'' তিনি বলেন।
একটি বৈঠকের সময় আমাকের ছদ্মবেশে থাকা প্রতিবেদক শাকিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তানিসাকে অনুরোধ জানান, যাতে তাকে ধন্যবাদ জানাতে পারেন। তখন তাকে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে শাকিল তার সাথে করমর্দন করেন।
উরচেস্টার এলজিবিটির সাথে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন তানিসা। ওই সংস্থাকে "আমাদের সংগঠন" বলে তিনি বর্ণনা করেন এবং বলেন, সেখান থেকে সদস্যপদের চিঠি-দৃঢ় প্রমাণ হিসেবে কাজে দেবে।
তিনি বিবিসির প্রতিবেদককে বলেন সে যেন পরবর্তী বৈঠকে অবশ্যই অংশগ্রহণ করে। সেখানে তার মতো বেশ কয়েকজন রয়েছে যারা এরকম ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন এবং ''সেখানে আসল আবেদনকারীও রয়েছে''।
তিনি বলেন, ''এটা করা জরুরি, কারণ স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে আপনার প্রমাণ করতে হবে যে, আপনি আসলেই একজন সমকামী আর আপনি একটি সমকামী গোষ্ঠীরও সদস্য''।
তানিসা দাবি করেন, উরচেস্টার এলজিবিটির পাঠানো চিঠি তিনি তার আবেদনের সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
''আমাদের সংস্থা থেকে আপনাকে চিঠি দেওয়া হবে যে, আপনি আমাদের একজন আসল সদস্য, আমাদের সাথে যুক্ত আছেন এবং যাকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনি। এ ধরনের প্রমাণ খুবই শক্তিশালী।''
আমরা ফুটেজ দেখাই ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইমিগ্রেশন আইনজীবী আনা গনজালেজকে। তিনি বলেন, তানিসা স্পষ্টতই আইন ভাঙছেন-"প্রতারণা করে ভুয়া দাবি তৈরি করছেন।"
''এ ধরনের লোকজন সত্যিকারের আশ্রয়প্রার্থী আর শরণার্থীদের জন্য কঠিন করে তুলছে,'' তিনি বলেন।
''বিশেষ করে কোনো ঘটনায় নির্যাতনের শিকার বা ভুক্তভোগী হওয়ার পরেও কোনো না কোনো ঘটনায় হয়তো সেটা প্রমাণ করা যায়। কিন্তু সমকামীদের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয় না। এটা নির্ভর করে শুধু কীভাবে আপনি উপস্থাপন করছেন এবং কীভাবে আপনি কতটা তুলে ধরতে পারছেন,'' তিনি বলেন।
গোপন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিবিসি নিউজের পক্ষ থেকে পরে তানিসার কাছে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তানিসা "যোগাযোগগত ভুল বোঝাবুঝি"র কথা বলেন এবং ভুয়া দাবি বা প্রমাণ বানানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন। এমনকি তিনি দাবি করেন যে, তিনি উর্দু ঠিক মতো বলতে পারেন না।
শাকিল বলেন, তিনি জানতেন না যে তানিসা এমন কিছু করবেন। উরচেস্টার এলজিবিটি জানায়, তারা তদন্ত করছে।
ল অ্যান্ড জাস্টিস সলিসিটরস বলে, তানিসার তাদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক নেই। তাদের লন্ডন অফিসে বিনা অনুমতিতে প্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটা তারা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে।
আমাদের আন্ডারকভার রিপোর্টার কখনো ওই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক ছিলেন না বলে তারা দাবি করে।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

একই সময়ে বিবিসির আন্ডারকভার প্রতিবেদক লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে থাকা কননাউট ল'এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আকিল আব্বাসির সঙ্গেও দেখা করেন।
আব্বাস পরামর্শ দেন যে, তিনি আমাদের প্রতিবেদককে এই দেশে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। এজন্য তিনি ভুয়া দাবির সপক্ষে কাগজপত্র তৈরির পরামর্শ দেন।
আব্বাসি সহায়তার জন্য সাত হাজার পাউন্ড ফি দাবি করেন এবং বলেন যে প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা "খুব কম"।
''অর্থ দেওয়ার পর কীভাবে এবং কী ধরনের প্রমাণপত্র যোগাড় করতে হবে, তার পরামর্শ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
সেজন্য কোথায় যেতে হবে বা কী করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হবে। তাদের সোসাইটি ও ক্লাব থেকে অবশ্যই প্রমাণ জমা দিতে হবে''।
বিবিসির সংবাদদাতা জানতে চান যে, এরকম একটি সমকামী ক্লাবে তাকে যেতে হবে কি না।
''অবশ্যই, তোমাকে যেতে হবে''।
''কিন্তু আমি তো সমকামী নই''।
আব্বাসি এই কথায় কিছুটা মজা পেয়েছেন বলে মনে হয়। তিনি বলেন, ''আমি সেখান থেকে কিছু ছবি তুলে নেবো''।
এই আইন উপদেষ্টা পরামর্শ দেন, আমাদের প্রতিবেদকের উচিত এমন কাউকে খুঁজে বের করা, যিনি তার পুরুষ সঙ্গী হিসেবে পরিচয় দেবেন।
যখন রিপোর্টার বলেন যে, পাকিস্তানে তার স্ত্রী রয়েছে, আব্বাসি তখন দ্রুত একটি সমাধান বাতলে দেন। তিনি বলেন, এর ব্যাখ্যা হবে পাকিস্তানের তুলনায় যুক্তরাজ্যে অনেক বেশি উদার, ফলে তিনি একজন পুরুষ সঙ্গী নিতে পেরেছেন।
''আপনার জন্য আমরা একটি বিবৃতি তৈরি করে দেবো। যখন সেটা আপনি একবার পাঠ করবেন, তখন আপনি বুঝবেন সেটা কেমন''।
'এটা এক বিশাল সমস্যা'
উরচেস্টার এলজিবিটি প্রতি মাসে সভা আয়োজন করে, যেখানে সারা দেশ থেকে অংশগ্রহণকারীরা আসেন, যাদের অনেকেরই আশ্রয় দাবিগুলো ভুয়া বলে মনে হয়।
তবে সমকামী সেজে থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের দ্বারা ব্যবহৃত কমিউনিটি গোষ্ঠীর মধ্যে উরচেস্টার এলজিবিটিই একমাত্র নয়।
লুটনভিত্তিক মুসলিম এলজিবিটি নেটওয়ার্ক এর ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া প্রতিষ্ঠাতা এজেল খান বলেন, "এটা এক বিশাল সমস্যা।
"অনেকেই আমার সংগঠনের পক্ষ থেকে সুপারিশপত্র দেওয়ার জন্য আমাকে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আমি কখনোই তা নিই না। আমার সব কাজ স্বেচ্ছাসেবামূলক"।
তিনি বলেন, কেউ কেউ এমনও বলেছেন, "আমি সমকামী নই, কিন্তু আমি এই দেশে থাকতে চাই"।
কতটি আশ্রয় আবেদন ভুয়া হতে পারে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা কঠিন।
তবে হোম অফিসের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে করা আশ্রয় দাবির ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নাগরিকদের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
২০২৩ সালে যে বছরটির সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায়, এলজিবিটি ভিত্তিতে করা ৩,৪৩০টি আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় এবং যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে প্রায় ১,৪০০টি নতুন আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে।
এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ আবেদন করেছিলেন পাকিস্তানি নাগরিকরা এবং আগের পাঁচ বছরেও প্রতি বছর তারাই এ ধরনের দাবির সংখ্যায় শীর্ষে ছিলেন।
একই বছরে, সব ধরনের আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নাগরিকরা ছিলেন মাত্র চতুর্থ। সর্বাধিক সাধারণ নাগরিকত্বের গোষ্ঠী এবং মোট আশ্রয় আবেদনের মাত্র ৬ শতাংশ তাদের ছিল।
যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে করা আশ্রয় আবেদনের বিষয়ে এর চেয়ে সাম্প্রতিক কোনো তথ্য নেই।
তবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পরিসংখ্যানবিদরা লক্ষ্য করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নাগরিকদের কাছ থেকে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে দ্রুত বেড়েছে—এছাড়া শিক্ষার্থী বা কাজের ভিসায় থাকা বাংলাদেশ ও ভারতের অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৩ সালে, যৌন অভিমুখিতার কারণে নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি করা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রায় দুই তৃতীয়াংশের আবেদন প্রাথমিক পর্যায়েই মঞ্জুর করা হয়েছিল।
আলি (ছদ্মনাম) ২০১১ সালে পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে আসেন।
তিন বছর পর তার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তিনি পরামর্শের জন্য এক আইনজীবীর কাছে যান। আলির ভাষ্য, যুক্তরাজ্যে থাকতে আশ্রয় চাইতে হলে তিনি যে সমকামী, এমন একটি কাহিনি বানাতে আইনজীবী তাকে পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, ওই আইনজীবী তাকে "নিজের জিপির কাছে যেতে এবং দেখাতে বলেছেন যে আমি বিষণ্নতায় ভুগছি, বিশেষ করে এই ভিসা সংক্রান্ত পরিস্থিতির কারণে"।
আলি আরও বলেন, "আমি আসলে ওষুধ খাইনি, কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ওষুধ সংগ্রহ করতে, যাতে আমরা হোম অফিসে প্রমাণ হিসেবে দেখাতে পারি যে আমি বিষণ্ন অবস্থায় চলে গিয়েছি"।
হোম অফিসের সঙ্গে প্রাথমিক সাক্ষাৎকারটি ভালো হয়নি এবং দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়ায় তার খরচ বেড়ে গিয়ে ১০ হাজার পাউন্ডের বেশি হয়ে যায়।
আইনজীবীর নির্দেশে তিনি প্রাইড মিছিলে অংশ নেন এবং ১০ বারের বেশি সমকামী ক্লাবে যান। প্রমাণ হিসেবে জমা দিতে ছবি তোলেন।
বিবিসি নিউজ এমন প্রমাণও দেখেছে যে, এইচআইভি নিয়ে বসবাসকারী মানুষের একটি দাতব্য সংস্থা থেকে সমর্থনপত্র পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন আলি। তিনি সেখানে বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন এবং মিথ্যা বলেছিলেন যে তার এইচআইভি আছে, তবে সেই চেষ্টাও সফল হয়নি।
শেষ পর্যন্ত আইনি খরচ বাড়তে থাকায়, যুক্তরাজ্যে আসার আট বছর পর ২০১৯ সালে তিনি পাকিস্তানে ফিরে যান।
২০২২ সালে তার স্ত্রী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে এলে, নিজের ব্যর্থ আশ্রয় প্রচেষ্টার কারণে আলি তার সঙ্গে যোগ দিতে পারেননি।
তবে আলি আমাদের জানান, তার তিন বন্ধু নিজেদের যৌন পরিচয় নিয়ে মিথ্যা বলেও আশ্রয় পেতে সফল হয়েছেন।
তিনি বলেন, "তারা এমনকি পাকিস্তানে বিয়ে করেও স্ত্রীদের এখানে এনেছে, এখন তাদের সন্তানও আছে"।

আরও কঠোর নিয়ম
হোম অ্যাফেয়ার্স সিলেক্ট কমিটির সদস্য লেবার এমপি জো হোয়াইট বলেন, বিবিসির অনুসন্ধানে যেসব আইন সংস্থা ও উপদেষ্টার ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে অবশ্যই "কড়াকড়ি ব্যবস্থা" নিতে হবে।
ব্যাসেটল'এর এমপি জো হোয়াইট বিবিসি রেডিও ফোর এর টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, তিনি চান পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করুক।
তিনি বলেন, "সরকারের জন্য এটা একেবারেই অপরিহার্য যে তারা এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এ ধরনের প্রমাণ আমি আশা করি সরাসরি পুলিশের কাছে যাবে এবং পুলিশ তাদের কার্যক্রম শুরু করে পুরো বিষয়টি ভেঙে দেবে"।
তিনি আরও আহ্বান জানান, পাকিস্তান থেকে আসা লোকজনকে শিক্ষার্থী ভিসা দেওয়া বন্ধ করতে হোম অফিস যেন পদক্ষেপ নেয়—যেমনটি গত মাসে আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, মিয়ানমার ও সুদান থেকে আসা নাগরিকদের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, যেখানে সরকার ব্যাপক ভিসা অপব্যবহারের কথা বলেছিল।
কনজারভেটিভ দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেন, বিবিসির অনুসন্ধান "অনেক আশ্রয় দাবির কেন্দ্রে থাকা প্রতারণা উন্মোচন করেছে", এবং চিহ্নিত আইন উপদেষ্টাদের "অভিবাসন জালিয়াতির দায়ে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত"।
তিনি যোগ করেন, "পুরো ব্যবস্থাটাই পচে গেছে"।
"আশ্রয় ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে হবে, যাতে শুধুমাত্র প্রকৃত ও ব্যক্তিগত নিপীড়নের শিকার খুব অল্পসংখ্যক মানুষ,যাদের দাবির পক্ষে বাস্তব প্রমাণ আছে, তারা যেন আশ্রয় পায়।আর অবৈধ অভিবাসীদের একেবারেই আশ্রয় চাইতে দেওয়া উচিত নয়।"
রিফিউজি কাউন্সিলের বহির্বিষয়ক পরিচালক ইমরান হুসাইন বলেন, "লাভের আশায় অসাধু উপদেষ্টারা যখন হতাশ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের শোষণ করেন, তা নিন্দনীয় এবং যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "প্রতিদিন আমাদের সামনের সারির সেবায় আমরা উগান্ডা ও পাকিস্তানের মতো দেশ থেকে আসা এলজিবিটিকিউ প্লাস শরণার্থীদের সঙ্গে কাজ করি, যারা কেবল তারা যেভাবে জন্মেছেন সেই কারণেই কারাবন্দি, সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং নিরাপদ ও খোলামেলা জীবন যাপনের জন্য ব্রিটেনে এসেছেন।''
''এই ধরনের অপব্যবহার যেন প্রকৃত আশ্রয়ের প্রয়োজন থাকা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করতে ব্যবহার করা না হয়।"
বিবিসির অনুসন্ধান নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় রিফর্ম ইউকের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ বলেন, "ব্রিটিশ জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি বিশাল অপরাধের সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ আছে। রিফর্ম ক্ষমতায় এলে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।"
হোম অফিস জানায়, প্রতারণা যুক্ত কোনো আশ্রয় আবেদন করা একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং আদালতে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।এরপর তাকে দেশ থেকে বহিষ্কারও করা হতে পারে।
এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, "যৌন পরিচয়ের কারণে প্রকৃত নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের সুরক্ষার জন্য তৈরি ব্যবস্থার অপব্যবহারের যেকোনো চেষ্টা নিন্দনীয়।
আশ্রয় ব্যবস্থা শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যাতে প্রতিটি দাবি কঠোর ও ন্যায্যভাবে মূল্যায়ন করা হয়।''
''শুধু যেসব ব্যক্তি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেন, তারাই সুরক্ষা পান। অপব্যবহার সক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হয় এবং তা বন্ধ করতে নিয়মিতভাবে পদ্ধতি পর্যালোচনা করা হয়।"
মার্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। এর ফলে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের এখন কেবল অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং তাদের মামলাগুলো প্রতি ৩০ মাস অন্তর পর্যালোচনা করা হবে।
এক দিন পর, আমাদের আন্ডারকভার প্রতিবেদকের সঙ্গে এক বৈঠকে তানিসা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, এসব পরিবর্তনের পরও সাজানো প্রমাণের ভিত্তিতে আশ্রয় পাওয়া কোনোভাবেই কঠিন হবে না।
তবে তিনি প্রতিবেদককে নিজের আবেদন দেরি না করতে চাপ দেওয়ার জন্য বিষয়টি ব্যবহার করেন।
তিনি সতর্ক করেন, "ওরা এটা এখন করেছে। কে জানে—আগামীকাল বা তার পরদিন আর কী করবে?"
বৈঠকের শেষ দিকে পরিবেশ কিছুটা হালকা হলে, নিজের 'ক্লায়েন্ট'-এর কাছে তানিসার একটি অনুরোধ ছিল।
"ভবিষ্যতে তোমার পরিচিত কারও সাহায্য লাগলে—তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে, তাই না?"








