অবসরের পর আমরা কেন মিথ্যা বলি

নাতি-নাতনীদের সাথে অবসরপ্রাপ্ত একজন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নাতি-নাতনীদের সাথে অবসরপ্রাপ্ত একজন

আপনি যখন ইন্টারনেটে রিটায়ারমেন্ট লিখে সার্চ দেন তখন দেখবেন সাদা চুলের একদল লোক তাদের রান্না ঘরে নাচ করছে, সার্ফিং করছে, হাস্যকর ইয়োগা পোজ দিচ্ছে কিংবা নাতি-নাতনীদের সাথে খেলা করছে-এমন সব ছবি আসবে।

কিন্তু বাস্তব অবস্থা অনেকের জন্য ভিন্ন হতে পারে। অনেকের জন্য অবসর গ্রহণের প্রথম কয়েক মাস অস্তিত্বে সংকট তৈরি হতে পারে - এমনটাই বলছেন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক টেরেসা আমাবিল।

তিনি বলছেন "এটা হতে পারে খুব নাটকীয় মুহূর্ত"।

চার বছর ধরে অধ্যাপক টেরেসা আমাবিল এবং তার দল ১২০ জন পেশাজীবীর সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে তিনটি কোম্পানি থেকে অবসর নিয়েছেন।

তারা সাক্ষাতকার-দানকারীদের কর্মজীবনের নানা দিক এবং সময় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। প্রাথমিক ফলাফল ছিল বেশ কঠিন।

তিনি বলেন, "এটা অনেকের কাছে অবাক করা বিষয়ের মতো লেগেছিল।"

মানুষ অবসরের ব্যাপারে অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে ভেবে থাকে। কিন্তু এটার জন্য মানসিক এবং সম্পর্কের দিকগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

"আমাদের চিন্তা করা দরকার আমি কী হবো, আমার আনুষ্ঠানিক কর্মজীবন যখন শেষ হবে তখন আমি কী হতে চাই। আমাদের গবেষণা বলছে, যারা এই বিষয়গুলো আগে থেকে চর্চা করে তাদের জন্য পরিবর্তনের সময়টা সহজ হয়"।

বিবিসি বাংলার আরো পড়ুন

গতকালের খবর

গবেষণার একটা বড় বিষয় উদঘাটন করা হয় যখন তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় তারা নিজেদেরকে কিভাবে বর্ণনা করে।

"তারা সাধারণত বলে 'আমি অবসরপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান, অথবা আমি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ বা আমি অবসরপ্রাপ্ত রসায়নের গবেষক'। তারা এখনো নিজেদেরকে আগের পেশার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে পরিচয় দেয়," বলছিলেন অধ্যাপক আমাবিল।

"কেউ-কেউ আবার অস্বীকার করে যে অবসর নিয়েছে, যেটা বেশ মজার। তারা বলে যে তারা এখন কোন পেশায় আছে, যদিও তার আগেই তিনি ঐ পেশা থেকে অবসর নিয়েছেন"।

Harvard professor Teresa Amabile
ছবির ক্যাপশান, অধ্যাপক টেরেসা আমাবিল

"আমরা তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন তারা এমনটা করে? একজন উত্তর দিয়েছিল, আমি আগের দিনের খবর হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই না। আমি এখনকার খবর হিসেবে থাকতে চাই"

কাজের বিস্ময়কর দেশ

Edmund Phelps at a lectern
ছবির ক্যাপশান, এডমন্ড ফেল্পস ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান

অধ্যাপক আমাবিল নোবেল ফাউন্ডেশনের একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন যেখানে নোবেল পুরস্কার জয়ীরা বক্তৃতা দিচ্ছিলেন।

এডমন্ড ফেল্পস ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি তার ৮০ বছরের মাঝামাঝি এসেও একবিন্দু থেমে থাকেননি।

তার কিছু দিন কাটে মাদ্রিদে বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়ে, প্যানেল প্রেজেন্টেশন এবং গণমাধ্যমে সাক্ষাতকার দিয়ে। তিনি বলছেন, " কাজ ভাল জীবনের জন্য মৌলিক বিষয়"।

এডমন্ড ফেল্পস এর মতে, অনেক মানুষের কাছে কাজ হল অর্থপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার একটা উৎস। একজন মা বা বাবা বাচ্চা বড় করতে যেয়ে দশকের পর দশক পার করে দেন, কিন্তু সেটা চিরস্থায়ী ব্যাপার না।

Older man with slightly younger woman on a jet ski

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জেট স্কি করছেন অবসরের পর

তিনি বলেন, প্রায় সবার জন্য কাজ হলো খুব প্রয়োজনীয় একটা রোল, যেটার ফলে নতুন কিছু আবিষ্কার করা যায়।

কাজের পৃথিবীটা একটা প্রগতিশীল এবং একটা চমৎকার জায়গা যেখানে আপনি আপনার নিজেকে পরীক্ষা করতে পারেন এবং দেখাতে পারেন যে আপনি কী করতে পারেন।

তিনি বলেন, বয়স্ক লোকদের এই স্থানটাতে অস্বীকার করাটা ভুল। বিশেষ করে যেসব দেশে আপনাকে একটা নির্দিষ্ট বয়সে অবসর নিতেই হয়।

অন্য আরেকজন নোবেল জয়ী মারিও ভারগাস লিওসা একমত পোষন করেন। তিনি তার ৮০ বছরে এসেও প্রতিদিন সকাল ১০ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজ করেন।

Mario Vargas Llosa
ছবির ক্যাপশান, মারিও ভারগাস লিওসা ৮০ বছরে এসেও প্রতিদিন সকাল ১০ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজ করেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন "আমি সপ্তাহের সাত দিন কাজ করি। বছরের বারো মাস কাজ করি"।

এবং আমার এটা মনে হয় না এটা আমার চাকরি। আসলে লেখাটা আমার কাছে একটা আনন্দ, যখন আমি খুব সমস্যার মধ্যে থাকি তখনো," বলছিলেন তিনি।

অবসরের বয়সের সময়সীমা অনেক দেশে বাড়ছে এবং এটা মানুষকে নানা দিক দিয়ে প্রভাবিত করছে।

যদি আপনি একজন লেখক বা অর্থনীতিবিদ হন তাহলে আপনার কর্মজীবন দীর্ঘ হতে পারে। আবার আপনি যদি শারীরিক পরিশ্রমের কোন কাজ করেন তবে সময়টা সে তুলনায় কম।

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর অধ্যাপক ডেভিড ব্লুম বলছেন, যদি সরকার বা কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয় যে পেনশন বা অবসরের পর অন্যান্য সুবিধা দেবে না তখন মানুষের মধ্যে একটা অস্থির অবস্থা বিরাজ করতে পারে।

Picture of protester at Tahrir Square in 2011

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, তাহরির স্কোয়ারে বিক্ষোভের দৃশ্য

"একটা বিষয় আমি মনে করি, আপনাদের অনেকের মনে আছে আরব বসন্তের কথা। যেটার সবটাই ছিল মূলত আকাঙ্ক্ষা, যা পূর্ণতা পায়নি। আমি মনে করি, আমাদের বয়স্কদের মধ্যে সেই বিষয়টা থাকতে পারে" বলছিলেন অধ্যাপক ডেভিড ব্লুম।

"আমরা এটা অনেক দেশে দেখেছি বিশেষ করে ইউরোপে। আমার মনে হয় এটা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে"।

যারা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করে তারা ষাট বা সত্তর বছর বয়সে একই রকম সুযোগ নাও পেতে পারে। কিন্তু যারা মাথা খাটিয়ে কাজ করে তারা সে সুযোগটা পেতে পারে।

অবসর নেয়ার বিষয়টা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। সেটা সরকারি বা বেসরকারি কোম্পানিই হোক না কেন।

উভয়েই নতুন পলিসি তৈরি করছে বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য। আবার আমাদের মধ্যে অনেকে আছে যারা ব্যক্তিগত এবং পেশাগতভাবে সেটা করছি।

যতদূর মনে হয়, অবসর গ্রহণের এই সমস্যার খুব কম সমাধান পাওয়া গেছে।