হিন্দুত্ববাদীদের রাম নবমীর মিছিল থেকে কতটা আলাদা বাংলার প্রাচীন রাম নবমী?

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
- Author, প্রত্যুষ রায়
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Author, ময়ূরী সোম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বৃহস্পতিবার বিভিন্ন উত্তর ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি রামনবমী পালন করেছে। গত কয়েক বছর ধরে রামনবমীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে রাজনীতি। এই দিনটি পালনকে কেন্দ্র করে এর আগে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাও হয়েছে।
যেভাবে গেরুয়া পতাকা ও তলোয়ার নিয়ে মিছিল করে রামনবমী পালন করা হচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, সেই ট্রেন্ড বেশ নতুন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই সব মিছিলের আয়োজন করছে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।
তবে বছর দশেক আগেও রাম নবমীতে এধরনের গেরুয়া শোভাযাত্রা পশ্চিমবঙ্গে দেখতে পাওয়া বেশ দুর্লভ ছিল। একই সঙ্গে এই সব শোভাযাত্রায় বিজেপি এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতাদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে এই উৎসবকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী ও দিলীপ ঘোষের মতো নেতারা এবছর যেভাবে এটিকে নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার করেছেন, সেভাবে এবছর রাম নবমীর সঙ্গে নিজেদের জড়ায়নি তৃণমূল কংড়গ্রেস দল।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের বক্তব্য, বিজেপি রাম নবমীর শোভাযাত্রার মাধ্যমে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করে থাকে।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা বলে থাকেন যে, রাম নবমীর মিছিলে তাদের অংশগ্রহণ করার মূল উদ্দেশ্য হলো, হিন্দিভাষী ভোটারদের সঙ্গে জনসংযোগ।
মূলত, পশ্চিমবঙ্গে রাম নবমীর মিছিল এখন দুই পার্টিরই জনসংযোগের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অস্ত্র হাতে, গেরুয়া পতাকা নিয়ে রামনবমীর মিছিলের সংস্কৃতি নতুন হলেও বাংলায় রামের পুজো নতুন নয়।
কয়েকশো বছরের পুরোনো রাম মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ জুড়েই। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয়ন ব্যানার্জীর মতে, "শান্তিপূর্ণভাবে রামনাম করা ও রামায়ণ পাঠ বাঙালির ঐতিহ্য, কিন্তু বর্তমানে রাম নবমীকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি করার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।"
বর্তমানের রামনবমী পালন ও বাংলার ঐতিহ্যবাদী রাম পুজো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে কেন আলাদা?

ছবির উৎস, ANI
রাম নবমী, বিজেপি ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বৃহস্পতিবার, ২৬শে মার্চ কলকাতার নিউটাউনে রাম নবমীর মিছিলে অস্ত্র নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বচসা বাঁধে ওই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে। শোভাযাত্রার সামনে ছিলেন বিজেপি নেতা ও বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির রাজারহাট-নিউটাউন কেন্দ্রের প্রার্থী পীযূষ কানোড়িয়া।
কলকাতার ভবানীপুরে রাম নবমীর মিছিল থেকে সেখানকার বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী জনতার উদ্দেশে বলেন, "মনে আছে তো রাম কোন ফুল দিয়ে মায়ের পুজো করেছিলেন?" স্বাভাবিকভাবেই, রাম ও পদ্ম ফুলের গল্পকে হাতিয়ার করে পশ্চিমবঙ্গে রাম-কেন্দ্রিক ধর্মানুভূতি বিজেপির পক্ষে উস্কে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
এ বছর কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে পারেনি কোনও সংগঠন। কিন্তু তবুও রাম নবমীর শোভাযাত্রায় বিজেপি ঢাক ঢোল পিটিয়েই অংশগ্রহণ করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এইসব মিছিলগুলির থেকে এ বছর দূরত্ব বজায় রেখেছে।
এদিন পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরায় রাম নবমী উপলক্ষ্যে একটি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন বিজেপি নেতা ও খড়গপুর সদর কেন্দ্রের প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। তিনি বার্তা দেন, "সারা বাংলা জুড়েই রাম নবমী পালিত হবে, বাংলা রামরাজ্য হবে।"
তার কথায় যে রামরাজ্য ও বিজেপি সরকার সমার্থক, তা সহজেই অনুমান করা যায় বিজেপি নেতাদের আগে দেওয়া বক্তৃতাগুলি শুনলে।
বছর তিনেক আগে, ২০২৩ সালে রাম নবমীর মিছিল ঘিরে হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় হুগলি জেলার রিষড়াতে। জারি হয় কার্ফু। একই বছর হাওড়াতেও রাম নবমীর মিছিল থেকে হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
তবে ২০১৮ সালে রাম নবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে আসানসোল-রাণীগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বড়সড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল।
গত কয়েক বছরে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়েছে রাম নবমীর মিছিলের বহর।
অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির মূল রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাগুলির মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়াও রাম ও রামরাজ্য বার বার তাদের রাজনৈতিক ভাষ্যের অংশ হিসেবে উঠে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই, রাম বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালে রাম নবমীর মিছিল ঘিরে একাধিক অঞ্চলে অশান্তির পরে মুম্বাইয়ের সেন্টার ফর স্টাডি অফ সোসাইটি অ্যান্ড সেকুলারিজম ও কলকাতার 'আমরা' নামক একটি সংগঠন বিস্তারিত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। ওই রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়, এই রাম নবমী উৎসবকে ঘিরে অশান্তি সৃষ্টির পরিকল্পনা আগে থেকেই করেছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Debajyoti Chakraborty vis NurPhoto/Getty
রাম নবমী নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান
"আমাদের ৩০০ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে রাম নবমী পালনের, আশির দশকে গজিয়ে ওঠা পার্টির থেকে রাম নবমী শিখব না আমরা," বিবিসিকে বলছিলেন নদীয়া জেলার শান্তিপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ব্রজকিশোর গোস্বামী।
ঘটনাচক্রে, ব্রজকিশোর গোস্বামীর পরিবার শান্তিপুরের ঐতিহ্যশালী 'বড় গোস্বামী' পরিবারের বর্তমান বংশধর। বাংলায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক চৈতন্যদেবের পার্ষদ অদ্বৈত আচার্যের বংশধর বলে পরিচিত এই পরিবার।
এই পরিবারের মন্দিরে একটি রাম মূর্তি রয়েছে। তবে রাম নবমীর দিন আলাদা কোনও পুজো হয়না এই বাড়িতে। বরং রথযাত্রার দিন রামকে রথে চাপিয়ে নগর পরিক্রমায় বের করা হয়।
২০২৩ সালে রাজ্যের একাধিক জায়গার রাম নবমীর মিছিল ঘিরে সংঘর্ষের পরে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে তৃণমূল কংগ্রেস।
সেখানে পার্টির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী সরাসরি "রাম নবমীর শোভাযাত্রার এই রূপকে বহিরাগত ও বাংলার সংস্কৃতির বিরোধী" বলে সমালোচনা করেন।
পরবর্তীকালে তৃণমূলের একাধিক নেতা অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন রাম নবমীর শোভাযাত্রায় অস্ত্র নিয়ে মিছিলকে বাংলার সংস্কৃতি-বিরুদ্ধ বলে দেখেন তারা।
উল্টে বাংলার ঘরে ঘরে যে সব দেবতাদের পুজো হয়, সেখানে গত কয়েক বছরে জোর দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার।
দিঘায় জগন্নাথ মন্দির, নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গন ইত্যাদি তৈরির মাধ্যমে তিনি যে বার্তা দিতে চাইছেন সেটা হল, বিজেপির হিন্দুত্বর রাজনীতির উপরে বাঙালির হিন্দুধর্মকে রাজনৈতিক প্রাধান্য দেওয়া।

ছবির উৎস, Pratyush Roy/BBC
পশ্চিম বাংলায় কি রাম সত্যিই 'বহিরাগত'?
রাম নবমী নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের এই অবস্থান সম্পর্কে একমত পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বুদ্ধিজীবী। তবে রাম-কেন্দ্রিক উৎসবকে বহিরাগত বলতে নারাজ তারা।
পুরাণ বিশেষজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি আগে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "বাংলায় কোনোদিন এই অস্ত্রের মিছিল নিয়ে রাম নবমী পালনের ইতিহাস ছিল না।"
তার কথায়, "এগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। শ্রীচৈতন্য রাম নবমী পালন করতে বলেছেন বটে তবে সেটা অন্তরের ভক্তি ও শান্তির মাধ্যমে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল নতুন করে রামচন্দ্রকে চেনাচ্ছেন।"
চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মানুষ গত ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে রামের পুজো করেন।
বাংলার প্রাচীন মন্দিরগুলিতে টেরাকোটার ফলকে রামের জীবনের বহু কাহিনী চিত্রিত রয়েছে। এ ছাড়াও রামরাজাতলা, কালনা সহ বহু প্রচীন জনপদে যে রাম মন্দিরগুলি রয়েছে, সেখানে রামের গায়ের রং গাঢ় সবুজ। তার গোঁফ রয়েছে, যা উত্তর ভারতে প্রচলিত রামচন্দ্রের মূর্তিতে দেখা যায় না।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা ছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মতো বহু সংগঠন রাম নবমী উপলক্ষ্যে রাম-পুজোর আয়োজন করে থাকেন তবে তার আচার-অনুষ্ঠান বিজেপি ও আরএসএসের রাম নবমী উদযাপনের থেকে বেশ অনেকটা ভিন্ন।

ছবির উৎস, Pratyush Roy/BBC
পার্থক্য রয়েছে বাংলার রামায়ণেও
ভক্তি আন্দোলনের যুগে মূল বাল্মীকি রামায়ণকে বহু ভাষায় নতুন করে লেখা হয়।
সেখানে রামের গল্পের থেকে ভক্তির ভাবই ছিল প্রধান। অঞ্চল ভেদে রামায়ণের গল্পে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
পুরাণ বিশেষজ্ঞ দেবদত্ত পট্টনায়েকের মতে, "প্রত্যেক অঞ্চলের রামায়ণে সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক সংস্কৃতির একটি ঝলক ফুটে ওঠে।"
তিনি জানান, মালয়ালম ভাষায় রচিত রামায়ণে রামের একটি বোন রয়েছে। তেমনই কৃত্তিবাস ওঝা রচিত বাংলা রামায়ণে রামকে দুর্গাপুজো করতে দেখানো হয়েছে। মূল বাল্মীকি রামায়ণ বা তুলসিদাসের রামচরিতমানসে দুর্গাপুজোর কোনও উল্লেখ নেই।
রাম নবমীর তিথি নিয়েও উত্তর ভারতের সঙ্গে বাংলার পার্থক্য রয়েছে। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২৬ সালের রাম নবমী ২৭শে মার্চ। কিন্তু উত্তর ভারত ও হিন্দিভাষী রাজ্যগুলি রাম নবমী পালন করছে ২৬শে মার্চ।
বাংলার বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী দলগুলিও ২৬শে মার্চ রামনবমী পালন করছে। এর তীব্র কটাক্ষ করেছেন ব্রজকিশোর গোস্বামী। তিনি বলেন, "বাংলার রামনবমী আজ (২৬শে মার্চ) নয়, কাল। শান্তিপুরে ৩৫০ বছর পুরোনো রাম মন্দির আছে। বিজেপি যেন বাঙালিকে রাম চেনাতে না আসে।"
রামায়ণ মহাকাব্য নিয়ে বলতে গিয়ে পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বলেন, "বাল্মীকি রামায়ণ করুণারসের কাব্য। রামচন্দ্র কোমল মনের মানুষ ছিলেন। রাম নবমীতে অস্ত্র নিয়ে মিছিল কোনও ভাবেই রামচন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।"
তবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের একটি বড় অংশের যে মন পরিবর্তন হচ্ছে তা স্পষ্ট। বহু বাঙালিই ইদানিং রাম নবমীর মিছিলে অংশ নিচ্ছেন।








