দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ইফতারে আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, Sanchit Khanna/Hindustan Times via Getty Images
- Author, প্রত্যুষ রায়
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
"গান্ধী লবণ আইন ভঙ্গ করেছিলেন, আমরা নোটিশ ভঙ্গ করেছি", ক্যাম্পাসে ইফতারের ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে জানিয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র নাদিম নাকি।
একের পর এক বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের। "দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হলো", গত মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ এই মর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডিন অঞ্জু ভালি টিকুর স্বাক্ষর করা একটি নির্দেশ জারি হয়।
নির্দেশনাটি নির্দিষ্টভাবে আইন বিভাগের জন্যই জারি করা হয়েছিল।
এর ফলে ওই বিভাগে আগে থেকে পরিকল্পিত একটি ইফতার অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়।
যদিও এই নিষেধাজ্ঞার পরেও আইন বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের একাংশ ছোট আকারে একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করেন। তবে বড় করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাবলিক ইভেন্ট আয়োজন আর করা হয়নি তাদের।
এর আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ওই অংশটি একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন। ওই পোস্টে লেখা ছিল, "সন্ধ্যা ৬টায় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের উমঙ্গ ভবনে দাওয়াত-এ-ইফতার আয়োজন করা হয়েছে।"
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের একাংশের তরফে এই আমন্ত্রণপত্রটি প্রকাশ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত উমঙ্গ ভবনে ওই অনুষ্ঠানটি হতে পারেনি।
তবে ক্যাম্পাসের একটি খোলা জায়গায় প্রতিবাদস্বরূপ ইফতার আয়োজন করেন ছাত্রছাত্রীদের ওই অংশটি।

ছবির উৎস, Asif Pathan
কর্তৃপক্ষের তরফে জারি করা নির্দেশনাটিতে ইফতার ইভেন্ট বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নাম উল্লেখ নেই, তবুও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতারের আয়োজনের ঘোষণা করার পরেই এই নোটিশ আসে।
১৭ই মার্চ জারি করা ওই নির্দেশে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ফ্যাকাল্টি অফ ল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, "সব ছাত্রছাত্রীদের জানানো হচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি চত্বরের মধ্যে কোনো প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক জমায়েত করা যাবে না।"
"পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত এই নির্দেশিকা বলবৎ থাকবে।"
ওই নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, "প্রশাসনিক ও সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয় মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের এই নিয়মাবলী মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।"
কী বলছে কর্তৃপক্ষ?
বিবিসির তরফে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ল-এর ডিন অঞ্জু ভালি টিকুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও তার ফোন বন্ধ থাকার কারণে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে এর আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের ডিরেক্টর রজনী আব্বি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, "কাল যদি অন্য ধর্মের কেউ এসে বলে যে তারাও তাদের ধর্মীয় ইভেন্ট ক্যাম্পাসের ভিতর আয়োজন করতে চান, তা আমরা করতে দিতে পারি না। এই অনুমতি দিলে পরবর্তীকালে আসা অনুরোধগুলোয় না বলা আমাদের জন্য সমস্যাজনক হবে।"
সাউথ ক্যাম্পাসের ডিরেক্টর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন "এই ধরনের অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।"
এই বক্তব্যকে 'ভিত্তিহীন' বলে দাবি করে পাল্টা আক্রমণ করেছেন আইন বিভাগের ছাত্র হিতেশ কুমার।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একজোট ছাত্ররা
মি. আব্বির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন হিতেশ কুমার। তিনি এই ইফতার পার্টির আয়োজকদের মধ্যে একজন ছিলেন।
বিবিসিকে হিতেশ কুমার জানান, "এই ইফতার পার্টিকে মুসলিম উৎসব বলে দেখা ভুল। এই ইভেন্টের আয়োজকরা বেশিরভাগই হিন্দু। আমরা ক্যাম্পাসে হোলি ও দীপাবলীও একসঙ্গে উদযাপন করি।"
মি. কুমার জানাচ্ছিলেন, এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সারা দেশেই যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষভাবে সব ধর্মকে সমান সম্মান দিয়ে চলতে চান, তাঁদের বিরুদ্ধে বার বার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়, হিতেশ কুমার ও ডিপার্টমেন্টের অন্য ছাত্রছাত্রীরা ছাড়াও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, আইনজীবী ও ভারতের জাতীয় যুব কংগ্রেসের রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ক আসাদ মির্জা।
তার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে ইফতারে উপস্থিত থাকার ছবি পোস্ট করেছেন তিনি।

ছবির উৎস, Hitesh Kumar
এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র নাদিম নাকি বিবিসিকে বলেছেন, "কয়েক মাস আগে ক্যাম্পাসে সরস্বতী পুজো হয়েছিল। গণেশ পুজোর আয়োজনও করেছিল ছাত্রছাত্রীরা। আমরাও তাতে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু আমরা যখন ইফতারের কথা বলতে গেলাম, তখন উনি বললেন, আমরা সুরক্ষাজনিত কারণে এর অনুমতি দিতে পারব না।"
তবে নাদিম নাকির দাবি, কী ধরনের সুরক্ষাজনিত সমস্যা হতে পারে, তা স্পষ্ট করেননি ডিন।
ওই ইফতারে অংশগ্রহণকারী এক ছাত্র আসিফ পাঠান জানিয়েছেন, "সবার ধর্মকে আমরা সম্মান করি, গত বছরও আমরা ইফতার পার্টির আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়েছিল।"
যদিও এবছর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইফতার আয়োজন করলেও কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি বলে জানিয়েছেন আসিফ।
সাম্প্রতিক অতীতে আরও বিতর্কে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়
গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখেও একটি নোটিশ জারি করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ওই নোটিশে বলা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো প্রকার বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, জমায়েতের অনুমতি দেবে না কর্তৃপক্ষ।
ওই নোটিশটিতে আরও বলা হয়, কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো স্লোগান দেন, প্রতিবাদ মিছিল বা বক্তৃতা আয়োজন করেন, মশাল জ্বালান, তা হলে সেই ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
'বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ' - উল্লেখ করা হয়েছিল ওই নির্দেশনাটিতে।
এই নির্দেশনাটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে শামিল হয়েছিল ডান ও বাম উভয় ছাত্র সংগঠনগুলিই।
ডানপন্থী ছাত্র সংগঠন এবিভিপি ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি নিজ নিজ ভাষ্যে এই নির্দেশিকার বিরোধিতায় একমত হয়েছে।
এই নোটিশটি এখন দিল্লি হাইকোর্টে বিচারাধীন।
ওই নোটিশে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) জারি না করলেও এমন বিজ্ঞপ্তির কোনো প্রয়োজন আদৌ ছিল কিনা, সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত।








